ট্রেন বা রেলগাড়ী হচ্ছে বর্তমান বিশ্বের একটি গুরুত্বপূূর্ণ এবং অন্যতম যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিশ্বের অনেক দেশেই এই যানটি যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম এবং লাভজনক বললে ভুল হবে না। আমাদের প্রতিবেশী ভারতেও এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে গমন করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হচ্ছে রেল। বাংলাদেশেও এর গুরুত্ব অপরীসিম। অথচ আমাদের দেশে এই খাতটি অত্যন্ত অবহেলিত এবং বঞ্চিত। এর যাত্রীসেবার মান এতটাই নিম্নমানের যে নিম্নবিত্ত এবং নিম্নমধ্যব্ত্তি পরিবার ছাড়া অন্যরা অনেকটা বাধ্য না হলে ট্রেনে যাতায়াত করতে চান না।
ব্যক্তিগত ভাবে আমি ট্রেনে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করি ২০০৫ সাল থেকে যখন গাইবান্ধা সরকারী কলেজে অনার্স পড়তেছিলাম। তখন প্রায় প্রতিদিন পীরগাছা স্টেশন থেকে গাইবান্ধা স্টেশনে যাতায়াত করতাম। অধিকাংশ সময়ে লোকাল ট্রেন ৪৮১/৪৮২ তে এবং মাঝে মধ্যে সেভেন আপ /ডাউন এ এবং খুব কম যাতায়াত করতে হতো তিস্তা অথবা করতোয়া এক্সপ্রেসে। প্রতিদিন সকাল ৮ টায় পীরগাছা স্টেশনে ট্রেনে উঠতাম ৯.৩০ টা বা ১০ টার মধ্যে কলেজে পৌছে যেতাম। এটার অন্য একটি নাম ছিল কলেজ ট্রেন। ট্রেনটির বেশিরভাগ ছিল ছাত্র-ছাত্রী এছাড়াও গাইবান্ধার অফিস আদালতের সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক-শিক্ষিকাসহ অসংখ্য সাধারন মানুষ। শুনেছিলাম বর্তমানে ট্রেনটির সময় পরিবর্তিত হয়েছে। সেই সময়ের ট্রেন ভ্রমনের অনেক স্মৃতি এখনো নাড়া দেয়।
এছাড়াও বর্তমান সময়ে কয়েকবার বিভিন্ন সময়ে ছুটি-ছাটাতে ট্রেনযোগে বাড়িতে যাতায়াত করেছিলাম যার মধ্যে পবিত্র ঈদের সময়ও রয়েছে। তাই বোধ করি ট্রেন ভ্রমনের কিছু নিজস্ব অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে কিছুটা আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাচ্ছি এবং সরকারের এ খাতে লোকসানের কিছু কারনও উল্লেখ করতে পারব আশা করি।
বাংলাদেশে সরকারী যত আয়কারী খাত রয়েছে প্রায় সকল খাতেই বছরের পর বছর সরকার লোকসান করতে থাকে। এবং সরকারও লোকসানের মুল কারন অনুসন্ধান না করে অথবা দেখেও না দেখার ভান করে সেই লোকসানের দায়ভার চাপিয়ে দেয় জনগনের উপর। যার মধ্যে চিনি, পাট, কাগজ শিল্প, জ্বালানী (তেল ও গ্যাস), বিদ্যুৎ, বিমান, নৌ এবং সর্বশেষ আলোচিত রেল পরিবহন অন্যতম।
উল্লেখ্য, এসব খাত আবার বেসরকারী ভাবে অনেক লাভজনক।
এর মূল কারন আসলে সরকার এবং সরকারী কর্মকর্তাদের অদুরদর্শীতা এবং অসহনীয় দূর্নীতি। ফলে ইতিমধ্যে পাট ও কাগজ শিল্প বন্ধ হয়েছে, চিনি শিল্প বন্ধের উপক্রম, বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিক ভাবে কমলেও আমাদের ঘাড় থেকে অতিরিক্ত মূল্যের বোঝা থেকে যাওয়া, জ্বালানী খরচ কমলেও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করে জনগনকে চাপে ফেলা এবং সর্বশেষ রেলের ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব যেন মরার উপর খড়ার ঘা হয়ে দেখা দিচ্ছে।
২০০৫ / ২০০৬ সালে যখন ট্রেন যোগে কলেজ যাতায়াত করতাম তখন লোকাল ৪৮১/৪৮২ এবং সেভেন আপ / ডাউন ট্রেন চারটি বেসরকারী খাতে ছিল। প্রথম দুটি ছিল বর্তমান সরকার দলীয় সাংসদ লিটন এর ইসলাম শিপ বিল্ডার্স এর অধীন এবং পরের দুটি ছিল জনাব নজরুল ইসলাম এর বান্না এন্টার প্রাইজের অধীনে। এ ট্রেন গুলি বেসরকারী খাতে দেয়ার অন্যতম কারন ছিল লোকসান অর্থাৎ সরকারী থাকা অবস্থায় কখনই এ ট্রেন গুলি লাভের মুখ দেখে নাই। অথচ বেসরকারী খাতে আসার পর তারা কখনও লোকসান করেছে বলে শুনি নাই। বরং মেয়াদ শেষে পুনরায় ইজারা নেয়ার জন্য একপ্রকার প্রতিযোগীতায় নামত। এর কারন কি??? একই ট্রেন একই গন্তব্য একই যাত্রী এবং যাত্রী সেবাও একই থাকার পরও সরকার কেন লোকসান করল আর বেসরকারী খাত কেন লাভের মুখ দেখল আপনারা বলতে পারবেন?
২০১২ সালে যাত্রী সেবার মান বৃদ্ধি এবং লোকসান কমানোর নাম করে ৫০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি করেছিল এবং ভর্তুকি তুলে দিয়েছিল। আর ভর্তুকি তুলে দেয়ার ফলে দেখা গেছে ৭০ থেকে ১১০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছিল।
যেমন বিমান বন্দর স্টেশন থেকে পীরগাছা শোভন ১৮০ টাকা থেকে বেড়ে ৩৮০ টাকা হয়েছে। এত বৃদ্ধি পাওয়ার পরও কেন রেলের লোকসান বন্ধ হলো না?? আর এবার বৃদ্ধি করা হচ্ছে ৭.৮ শতাংশ।
আমার বিশ্বাস রেলের ভাড়া যদি আরও ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয় তার পরও এ লোকসান বন্ধ হবে না কারন মূল সমস্যায় হাত না দিয়ে সরকার গৌন বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করছে।
মুল বিষয়গুলোর কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করছি,
১। বিপুল সংখ্যক যাত্রীদের তুলনায় আসন সংখ্যা এবং কোচ সংখ্যা অনেক কম। ফলে অনেক যাত্রী ট্রেন ভ্রমন না করে ফিরে যাচ্ছে। এবং অধিকাংশ যাত্রী বিনা টিকিটে ট্রেনে দাড়িয়ে অথবা ট্রেনের ছাদে ভ্রমন করছে। সুতরাং সরকার বিশাল অঙ্কের টাকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
২। ট্রেনে পর্যাপ্ত পরিমান টিটি (টিকিট পরিদর্শক) নেই। ৫/৭ জন যা থাকে তারা আবার তাদের দায়িত্ব ঠিক ভাবে পালন করেন না। দেখা গেছে অনেক যাত্রী বিনা টিকিটে বিমান বন্দর স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠে টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ এমনকি নাটোর, সান্তাহার পর্যন্ত গিয়ে নেমে গেলেও একবারের জন্য টিটির সম্মুখিন হতে হয় না। একদিন এ সুযোগ পেলে দেখা যায় ঐ যাত্রী পরের দিনগুলো একই ভাবে বিনা টিকিটে ভ্রমন করতে থাকে। আর যদি কখনো টিটির মুখে পড়ে তাহলে টিটির হাতে ৩০০/৩৫০ টাকার জায়গায় ১০০/১৫০ টাকা ধরিয়ে দিলেই হয়ে যায়। আর সেই টাকা বিনা রিসিটে হওয়ায় সরাসরি টিটির পকেটে চলে যায় যা দিন শেষে সকল টিটি মিলে ভাগ করে নেয়।
এ গুলো আমার স্বচক্ষে দেখা ঘটনা। যারা বিভিন্ন সময় বিশেষ করে ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহায় ট্রেনে যাতায়াত করেছেন তারা এসব দেখেছেন নিশ্চয়ই।
এর আগে আমি যে দুটি ট্রেন এর কথা বলেছিলাম যা সরকারের অধীনে থাকায় লোকসান এবং বেসরকারী থাকায় লাভের মুখ দেখেছিল তার একটাই কারন তা হলো সকল যাত্রীদের টিকিট নিশ্চিতকরন। প্রতি বগিতে দুজন করে টিটি থাকত । তারা বগির দুই দরজা দিয়ে ঢুকত আর পর্যায়ক্রমে সকল যাত্রীদের টিকিট চেক করত। এমন একটি যাত্রীও পাওয়া যেতনা যারা বিনা টিকিটে একটি স্টিশনও যেতে পেড়েছিল। যদি ২/১ জন সময় স্বল্পতার কারনে কাউন্টার থেকে টিকিট কাটতে না পারত তাহলে টিটিরা বগিতেই রিসিট এর মাধ্যমে জরিমানাসহ টাকা নিয়ে নিত।
তাই সরকারের মাননীয় রেলমন্ত্রীকে বলতে চাই,
প্রথমত ট্রেনের যাত্রী সেবার মান এমন ভাবে বাড়ান যেন যাত্রীগন বাসের চেয়ে ট্রেনের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়,
দ্বিতীয়ত, ট্রেনের কোচ ও আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করুন যেন একটি যাত্রীকেও দাড়িয়ে অথবা ছাদে যেতে না হয়। অথবা ট্রেনের সংখ্যা বাড়িয়ে দিন আর নির্দিষ্ট আসন সংখ্যার অতিরিক্ত যাত্রী উঠানো বন্ধ করুন। এবং সমস্ত যাত্রীদের টিকিট কাটা নিশ্চিত করুন।
তৃতীয়ত, পর্যাপ্ত সংখ্যক টিকিট পরিদর্শক নিয়োগ করুন এবং তাদের সততা নিশ্চিত করুন। তারা যেন প্রতিটি যাত্রীর টিকিট নিশ্চিত করতে পারেন সেই ব্যবস্থা করুন।
তারপরও যদি রেলে লোকসান হয় তাহলে ভাড়া বৃদ্ধি করতে পারেন জনগন কোন আপত্তি জানাবে না বলে আমার বিশ্বাস।
সরকারকে বলতে চাই আপনারা একটি ফুটো কলসে যতই পানি ঢালুন না কেন কলসটি কখনই ভড়াতে পারবেন না।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জানুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৩:৪৮