আহ কি শান্তি !!! সাবমার্ষিবেল বসালেন আর ধুমায়া পানি পাচ্ছেন। আজকের বর্তমান খুব শ্রীঘ্রই অতীত হয়ে যাবে। কারন রিজার্ভ ওয়াটার বা ভূ-গর্ভস্ত পানি ফুরিয়ে আসছে। ওয়াটার টেবিল বা পানি পাবার স্তর দ্রুত নীচে নেমে যাচ্ছে।
আমার মনে আছে, ছোট বেলায় আব্বা ২২ফুট গভীরেই পানির লেয়ার পেলেন টিউবওয়েল বসানোর সময়। তিন চাপে ৫লিটারের বালতি ভরে যেত। দারুন স্বাদ আর ঠান্ডা। সেই একই জায়গায় এখন ৭৬ ফুট গভীর করে পাইপ বসাতে হয়েছে। ৩ হর্সপাওয়ারের সাবমার্সিবেল পাম্প বসাতে হয়েছে। তাও বেশ সময় লাগছে ১০০০ লিটারের ট্যাঙ্ক ফুল করতে।
শুনেছি ঢাকা সিটিতে ৭০০ফুটের গভীরে যেতে হচ্ছে, গাজীপুরে ৩০০ফুটের ওপরে। উত্তর বঙ্গে কম বেশি ৫০ফুট। নদী বা খালে যথেষ্ট পানি নেই। ভূ-গর্ভস্থ পানিতে নির্ভশীলতা বেড়েছে। ভবীষ্যতের যুদ্ধ হবে পানি নিয়ে। যার হাতে যত পানি থাকবে, সে তত ধনী-ক্ষমতাশালী হবে, এরকম শুনেছি বহুকাল আগে থেকে। ততদিন বেঁচে থাকলে আবার পোষ্টাবো। তবে গত মাসে ইরান - আফগানিস্তান সংঘর্ষ হয়েছে নদীর পানি বন্টন নিয়ে। ফুরাত নদী বা নীল নদের পানি নিয়ে ঝামেলা তো অনেক আগেই শুরু হয়েছে।
পৃথিবীর বহির্ভাগের ৭১% পানি, বাকিটা স্থল। এই ৭১% এর ৯৬.৫% হল লবনাক্ত। বিজ্ঞানীরা বলেন, প্রায় ৩.৫% অলবনাক্ত পানি, যার ভেতরে মাত্র ০.৫% ভাগ সুপেয় পানি আছে যা আমরা ব্যবহার করতে পারি, যার বেশির ভাগটা নদী-নালা, ঝরনা, আইস, মেঘ বা মাটির সাথে মিশে আছে। একজন মানুষের জন্যে প্রায় ২২ মিলিয়ন গ্যালন ব্যবহার যোগ্য অলবনাক্ত পানি আছে যদি ৩.৫% ধরি। কাজেই মাথাপিছু আসলে ২২মিলিয়ন গ্যালন পানি নেই। হয়ত অদূর ভবিষ্যতে ঢাকাতে বিদ্যুৎ বা গ্যাসের মত পানি সাপলাই হবে মিটারে।
আবার এই যে সুপেয় পানি, যা কিনা বহুবার রিসাইকেলিন হয়েছে। এমনও হতে পারে আমরা ডাইনোসার বা ম্যামোথের মূত্রের মাধ্যমে যে পানি বেরিয়েছে, সেই পানি খাচ্ছি। হিমালয়ের সাধুরা যে পস্রাব করেছে কৈলাশ শৃঙ্ঘে বসে, তার পিউরিফাইড জলটাও বাঙ্গাল-রা খেয়েছে।
বর্তমান দুনিয়ায়, সবচেয়ে বেশি ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে ভারত, তারপর পাকিস্তান, সৌদি অ্যারাবিয়া, সিরিয়া। যার ৯০ ভাগ ব্যবহৃত হয় শুধু চাষাবাদের জন্যে। বাংলাদেশে প্রায় ৭০% ভূগর্ভস্থ পানি পান করা, চাষাবাদ আর মৎস্য উৎপাদনে ব্যবহার করে। ভারতের একছত্র ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তলনের জন্যে পৃথিবীর ম্যাগনেটিক ফিল্ড বা মেরু কিছুটা সরে যাচ্ছে। যেটা প্রমানিত। অন্যদিকে চীন কয়েক শত বৃহদাকার ওয়াটার রিজার্ভ তৈরী করে নদীর পানি প্রত্যাহার করে বিশাল মজুদ তৈরী করেছে। ফলাফল পৃথিবীর আহ্নিক গতিকে পরিবর্তন করছে। সেটাও প্রমানিত। পানির স্বাভাবিক পরিবেশ-প্রতিবেশ-অবস্থান খুব বড় একটা ফ্যাক্টর।
২০৪০ সাল নাগাদ কোন কোন দেশ তাদের ভূ-গর্ভস্থ পানির প্রায় ৮০ ভাগ শেষ করে ফেলবে। তালিকায় প্রথম, ভারত, এছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, জর্ডান, আরব অঞ্চল, চীন, জাপান, ইরান, মেক্সিকো, ইংল্যান্ডের মত দেশ তো আছেই। ভাল কথা হল, কিছ কিছু দেশ পানির রিজার্ভ নিয়ে নানা ঊদ্দ্যোগ নিয়েছে। তারা নানা উপায় বের করেছে, পানিকে ভূগর্ভে ফিরিয়ে দিতে। মানে ভু-গর্ভস্ত পানি রিজার্ভে চাপ কমিয়ে আনতে। সেগুলো জানানোর চেষ্টা করব, সাথে নিজের কিছু কনসেপ্ট/আইডিয়া শেয়ার করব। আপনাদের মাথায় কিছু থাকলে অবশ্যই সেটাও বলবেন :
১। পানি ব্যবহারে মিতবায়ী হতে হবে। যেমন ধরুন, দাঁত ব্রাস করছেন, ট্যাপ বন্ধ রাখুন। ব্রাস শেষে চালু করুন। পানির ট্যাকে অটো সুইস লাগান। ট্যাপকল দিয়ে পানি লিক করছে, ঠিক করে ফেলুন। বাগানে পানি দিচ্ছেন, অতিরিক্ত দিয়ে ফেলছেন। হয়ত গড়িয়ে ড্রেনে যাচ্ছে। হয়ত ঘরের মেঝে পরিষ্কারই আছে, কাজের বুয়া আসছে, টাকা উসুল করতে আবার মোছালেন, যেটা দরকার ছিল না। হয়ত পানির বিল বাসাভাড়ার মধ্যে সংযুক্ত, তাই ইচ্ছামত খরচ করছেন, ভাবছেন হয়ত- পানির টাকা তো দিচ্ছি, এই মানসিকতা থেকে সরতে হবে। মৎস খামারিরা দিনে দুবার মাছের ট্যাঙ্কের পানি পরিবর্তন করেন, তারা ড্রেন করে কৃষি জমিতে দিয়ে দিন, অথবা একটা ডোবা বানিয়ে ডোবায় ফেলুন ড্রেনে না ফেলে। একটা জিন্সের প্যান্টের জন্যে ২২লিটার পানি লাগে, ৩টি গার্মেন্টস উন্নত টেকনোলজি ব্যবহার করে ১০লিটারে নামিয়ে এনেছে, যেটা কিনা ভবীষ্যতে ২ লিটারে হবে। এগুলোই দরকার পানি বাঁচাতে, দেশকে বাঁচাতে। সব বায়ার শ্রমিকের মজুরি+কাপড়ের দাম দেয়, বহু মূল্যবান পানির দাম দেয় না।
২। হাওড় বাওড় নদী নালা খাল বিল ডোবা পুকুরের স্বরুপ ঠিক রাখতে হবে। ভূ-স্তর কে পানি শোষনের জন্যে সুযোগ দিতে হবে। পুকুর, ডোবা বিল যাই বলুন না কেন এগুলা স্পন্জের মত হয়ে কাজ করে। পানি দ্রুত শুষে নিতে সাহায্য করে। কিন্তু যদি জলাশয়ে পলিথিন ফেলেন, নাগরিক বর্জ্য ফেলেন, ডাইংয়ের বর্জ্য ফেলেন, কংক্রিট বা শক্ত তল তৈরী করে এমন কেমিকেল ফেলেন, যদি নাব্যতা নষ্ট করেন, তাহলে তার স্বরুপ আর ঠিক থাকবে না। সে আর ঠিক মত পানি শোষন করতে পারবে না। আপনাদের চোখের সামনেই তাই সহস্র প্রমান আছে। বুড়িগঙ্গাতে ৩০ ফুটের বেশি পলিথিন স্তর, তুরাগে নাকি ১৫ ফিটের বেশি সলিড স্তর, সুরমাতে ১০ফিট স্তর, করোতয়ায় ২৫ফুট স্তর শহরের কাছাকাছি এলাকায় যমুনার বেড উঁচু হয়ে যাচ্ছে, পদ্মা শুকিয়ে যাচ্ছে, পুকুরগুলো ভরাট করে আবাদী জমি, মার্কেট বা মাঠ বানানো হচ্ছে। যেটা হতে দেয়া উচিত না। বেশির ভাগ নদী নালা হাওড় বাওড় এর তলদেশে ফাটল থাকে, যা দিয়ে ভু-ভাগের গভীরে খুব সহজে পানি যায়। রিজার্ভ তৈরী হয়। কিন্তু আপনি আমি যদি সে মুখ গুলো বুজে দেই, তাহলে রিজার্ভে পানি যাবে কিভাবে? আপনি হয়ত জেনে থাকবেন, শুধু অতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইডের জন্যে বৈশয়িক উষ্ঞতা বাড়ে না, ঊন্মুক্ত জলাশয় কমে গেলেও কিছু বাড়ে, কংক্রিটের দালান বাড়লেও বাড়ে, গাছ কমে গেলেও বাড়ে। মানে হল, তাপ শোষনের উপাদান কমে গেলেও গরম বেশি লাগবে।
৩। বৃষ্টির পানির সৎ ব্যবহার করতে হবে। আপনার টিনের চালায় বা বাসার ছাদে পাইপ লাগিয়ে বৃষ্টির পানি ধরে পানির ট্যাঙ্কে সংরক্ষণ করুন। যদি ব্যবহার না করতে চান, তাহলে মাটিতে ৫-১০ফিট গর্ত করে, সেখানে ছেড়ে দিন। টিউবয়েলের পানির লেয়ার ভাল থাকবে। ফুলের বাগানে পানি ছিটানো লাগবে না। খুলনায় কিন্তু বড় আকারের কয়েকটি পুকুরে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং তা ড্রিঙ্কিং ওয়াটার হিসেবে সাপলাই দেয়া হচ্ছে। আপনিও শুরু করতে পারেন এমন ব্যবসা। এদিকে সমতলের চাষীরা নিজেদের জমীর চার কোনায় চারটি করে ৫ ফুটের গর্ত করে রাখতে পারেন, বৃষ্টির পানি সহজে মাটির গভীরে যাওয়ার জন্যে। রাজস্থানের মানুষ এখন জমিতে ২০ফুটের ছিদ্রযুক্ত পাইপ জমির আইল বরাবর পুতে রাখছে যাতে বৃষ্টির পানি সহজে নীচে যেতে পারে এবং খুব ভাল ফলাফলও পাচ্ছে। ৮০র দশকের আগে, আমাদের কৃষকরা জমির এক কোনায় ছোট ছোট কুয়া খুড়ে রাখতেন। সেখানে পানি জমত, ছোট ছোট মাছ পেত, পানি সেচ দিত আবার নিজের অজান্তেই অতিরিক্ত পানি জমির উপরি তলে রিজার্ভ করতেন। এখনও এমন কুয়া করা সবার উচিত ।
৪। ওয়াটার শেড স্কেল পদ্ধতি ব্যবহার করা। এক্ষেত্রে উচু জমি থেকে নিচু জমির দিকে বা পাহাড়ের ঢালে ক্রমাগত নির্দিষ্ট দূরত্বের পর পর অগভীর ড্রেন কাটা হয় বিচ্ছিন্ন ভাবে। পাহাড়ের গোড়ায় বা সব শেষ নিচু জমিতে থাকে কিছুটা গভীর পুকুর বা ডোবা। যখন বৃষ্টি হবে তখন প্রথমত পানি হু হু করে না নেমে অগভীর ড্রেন ডিঙ্গিয়ে ধীর গতিতে নামবে, ড্রেন বা পরিখা গুলো পানি শোষন করার সাথে সাথে ধরেও রাখবে। অন্যদিকে অভিকর্ষজ বলের টানে উঁচু স্থান থেকে নিচু স্থানে সপ্তাহ-মাস ব্যাপী ধীরে ধীরে পুকুর/ডোবায় গিয়ে জমা হবে। যেহেতু ডোবা পুকুরের পানি উপছে ছড়া হয়ে নদীতে পড়ছে না, তাই বেশির ভাগ পানিও স্থানীয় ভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে। ধীরে ধীরে ভূগর্ভেও চলে যাচ্ছে। একটা দারুন ভিডিও আছে। এখানে দেখতে পারেন।
৫. স্পাইরাল ট্রেন্স পদ্ধতি ব্যবহার করা। পাহাড়ে যারা আছেন, তারা পাহাড়ের গায়ে স্পাইরাল খাজ করতে পারেন, যাতে বৃষ্টির পানি ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ে, উদ্দ্যেশ্য হল যাতে পাহাড়ের মাটি বেশি সময় পায় পানিটাকে শোষন করতে। চীনে কিন্তু এই টেকনিক স্থানীয় চাষীরা ব্যবহার করছে বহু আগে থেকে। বাংলাদেশের জুম চাষীরা শুধু বর্ষাকালের অপেক্ষায় থাকে। মিডিয়া সব সময় বলতে থাকে, পাহাড়ে খাবার পানির খুব কষ্ট। ভাই আপনারা বৃষ্টির পানি রিজার্ভ করা শেখান না কেন? পাহাড়ে (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, চট্রগ্রাম, খাগড়াছড়ি, সিলেট...) কমবেশি ৬ মাস বৃষ্টি হয়। কম্পিউটারের সামনে বসে বসে রিপোর্ট লিখলে তো কোন ফায়দা নাই।
৬. ওয়াটার বেসিন আইডিয়া প্রয়োগ করা। আমাদের গ্রামাঞ্চলে মাঝে মাঝে দেখা যায়, পাথারে অনেক জমির মাঝে হঠাৎ একটি পুকুর। শুষ্ক মৌসুমে আগের দিনের চাষীরা সেই জমি গুলোর মাঝের পুকুর থেকে সেচ দিতেন। আবার বর্ষা শেষে সেখানে জমে থাকা মাছ ধরা হত। এ ধরনের আইডিয়াটা পানি আনডার গ্রাউন্ডে পাঠানোর জন্যে চমৎকার একটি আইডিয়া।
৭. ওয়াটার আন্ডারগ্রাউন্ড পাম্পিং পদ্ধতি ব্যবহার করা। আমরা তো সব সময় মটর দিয়ে পানি তুলি। কিন্তু ওয়াটার রিজার্ভ ঠিক রাখতে আমরা উল্টো কাজটাও করতে পারি। মানে পাম্প করে উপরিতলের অতিরিক্ত পানি মাটিতে পুশ করতে পারি। ধরুন বর্ষায় আপনার এলাকায় বন্যার পানি ঢুকেছে। সেটা রাতারাতি পাম্প করে মাটির নীচে পুশ করলেন। ঢাকাতে বাধের এক পাশের পানি অন্য পাশে নদীতে ফেলা হয়। সেটা না করে ভূ-অভ্যন্তরে পাঠিয়ে দেয়া যায়। কিছু কিছু গার্মেন্টস তাদের ব্যবহৃত দূষিত পানি পাম্প করে মাটির গভীরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। কারন তাদের ওয়াটার চেম্বার নেই। যদিও এটা অপরাধ। কিন্তু আমি মনে করি এক দিক দিয়ে তারা ভালই করছে। কিছুটা হলেও মাটির গভীরে পানি যাচ্ছে যদিও pH লেভেল খারাপ হচ্ছে। অতিরিক্ত পানি উত্তলনের জন্যে বিল্ডিং ডেবে যাবার যে সম্ভাবনা, সেটাও থাকছে না। সরকারের উচিত প্রত্যেকটা সিটিতে ড্রেন/সুয়ারেজের পানি নদীতে না পাঠিয়ে রিসাইকেলিং করে মাটিতে ইনজেক্ট করা। ধরুন ডিব টিউবয়েল ১২০০ফুট গভীরে আছে, তাহলে ১০০-২০০ ফুটের ভেতরে ইনজেক্ট করবে।
অন্যদিকে গ্যাস ফিল্ড বা খনিজ আহরনকারী সংস্থাগুলো পরিত্যাক্ত খনিগুলো বর্ষার/বন্যার অতিরিক্ত পানি দিয়ে ভরিয়ে দিতে পারে। আমি জানিনা এর কারনে কোন বিধ্বংসী প্রতিক্রীয়া ঘটবে কিনা।
৮. হিট এক্সচেন্জার টেকনোলজি বামিস্ট ক্যাচার টেকনোলজি ব্যবহার করা। এগুলো ছড়াও আরও অনেক পদ্ধতিতেবাতাস থেকে পানি হার্ভেস্ট করা যায়। যদি আমরা ভূ-গর্ভস্থ রিজার্ভ ওয়াটার ব্যবহার কমিয়ে দেই, তাহলে সময়ের সাথে সাথে সেটা পূরন হবার সম্ভাবনা থাকে প্রাকৃতিক ভাবেই্। আমেরিকায় সব সময় একই ওয়াটার চেম্বার থেকে পানি উ্ত্তোলন করে না। তারা রিজার্ভ পূরন হবার সুযোগ দেয়। বাংলাদেশে যত সময় পর্যন্ত পানি ওঠে, ততক্ষনই সেখান থেকে পানি তোলা হয়। দারুন না? যদি অন্যান্য দেশের মত বিশাল বিশাল সিঙ্ক হোল তৈরী হত, মজা বুঝত। অবশ্য ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, যশোহর সহ আরও কিছু জায়গায় ছোট ছোট সিঙ্ক হোল তৈরী হচ্ছে, বাঙ্গালি বুঝতেছে না। ভাবছে, একরাতে পুকুরের পানি শুকিয়ে গেছে বা জমির মাঝে একটা ৫ হাত গর্ত হয়েছে, তেমন কিছু না। বুঝবা বাপ ধন... বুঝবা !
৯. পানির বহু মাত্রায় ব্যবহার নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে পানি ছাড়া বোধায় সব কিছুই বহুবার বহু উপায়ে ব্যবহৃত হয়। যেমন ধরুন কাগজ বা প্লাস্টিক। কত গ্রেডের কত কোয়ালিটির বা কত ভিন্ন ভিন্ন মানের-দামের পন্য যে তৈরী হয় ভার্জিন-রিইউজড পন্য থেকে, তা কল্পনাতীত। পন্য থেকে পন্য, রিসাইক্লিং করে করে.... করে। কিন্তু পানির কথা চিন্তা করুন, আমরা একবারই ব্যবহার করি। ভারতের রতন টাটা তার একটি কার ইন্ডাসট্রির ব্রাঞ্চ করলেন এমন একটি এলাকায় যেখানে পানির খুব সঙ্কট। সেই মটর কারখানায় একই পানি ২ বার ব্যবহৃত হয়ে তারপর যেত কৃষকের জমিতে। কৃষককে তিনি পানি দিয়েছিলেন বিনা মূল্যে। এমনকি আলাদা ড্রেনেজ ব্যবস্থা করেছিলেন যাতে কৃষকেরা সহজে জমিতে সেই পানি সেচ দিতে পারে। স্বভাবতই সেখানে প্রচুর শস্য ফলল। গবাদী পশুর খাদ্য উদ্বৃত্ব হল। কৃষকরা পশু পালন বাড়িয়ে দিল। টাটা তখন ডেইরী পার্ম খুললেন। বিনা ইনভেস্টমেন্টে লাখ লাখ গ্যালন দুধ পেলেন। ব্যবসা করলেন। আমাদের শিল্পপতিরাও তাদের ইন্ডাসিট্রিয়াল পানি কৃষিকাজে ব্যবহার করতে পারেন। সূচারুভাবে বললে পানির রিজার্ভ, না ফুরিয়ে যেতে ঊদ্দ্যোগ নিতে পারেন।
১০. জলাধার সংষ্কার করা এবং স্বরুপ পরিবর্তন না করা। আমাদের দেশে ২০৫টি রেকর্ডেট নদ- নদী ছিল। এসব নদী আবার অসংখ্য শাখা নদী বা খাল বিলে যুক্ত ছিল। বেশির ভাগ ভরাট হয়ে গেছে বা যাচ্ছে। আপনি যদি, নিজের এলাকার খাল বা হাজা পুকুর ডোবা প্রতি বছর পরিষ্কার করেন, ১-২ফুট করে পলি বা তলানি সংগ্রহ করেন, তাহলে ঐ জলাধারের বা খালের পানি শোষণ ও ধারন ক্ষমতা বেড়ে যাবে। সরকারের উচিত কোন ক্রমেই রেকর্ডকৃত জলাধারের স্বরুপ পরিবর্তন করতে না দেয়া। শহরাঞ্চলের অনেক পুকুর বা খাল ভরাট করে মার্কেট হচ্ছে। গ্রামে খালের বা বিলের মাঝ বরাবর নতুন রাস্তা-হাট-বাজার-মসজিদ বানাচ্ছে। আজব দেশ আমাদের।
নদী-নালা যদি যথেষ্ট গভীর থাকে এবং প্রতিবন্ধকতা না থাকে, তাহলে বন্যা বা বর্ষার পানি বেশিক্ষণ থাকবে না। নদীর তলদেশ ড্রেজিং করা উচিত নিয়মিত। পানি প্রবাহে বাধা পেলেই পলি পড়ে ভরাট হতে থাকবে। এখন তো পলির সাথে প্লাস্টিক বেশি পড়ে। নদীর বেড উঁচু হয়ে গেলে পানি দুকূলে উপ্চে পড়বে সেটাই স্বাভাবিক। আমাদের দেশে যেটা এখন কমন ব্যাপার। এদিকে কঠিন তলানি জমা হওয়ায়, পানি রিজার্ভে যেতে পাচ্ছে না। পরবর্তী সময়ে পানি সরে যাবার সাথে সাথে ভাঙ্গন শুরু হচ্ছে। বেলে মাটি বা বালেময় মাটির জন্যে সেটাই স্বাভাবিক। যমুনা নদীর আশ পাশের মানুষ এ ব্যাপারে বহূ অভিঙ্গ। যদি নদীর গভীরতা বর্তমানের চেয়ে আরও ৩০-৬০ফুট বেশি থাকত, নাব্যতা থাকত, তাহলে যুমনা বা পদ্মা পাড়ের মানুষদের প্রতিবছর বন্যায় কষ্ট পেতে হত না। যদি বুড়িগঙ্গা ড্রেজিং করা থাকত, খালগুলো পরিষ্কার থাকত, তাহলে ঢাকাবাসীকে প্রতি বর্ষায় ডুবে যেতে হত না।
আমি তো মনে করি বালু ব্যবসায়ীরা নদী ড্রেজিং এর কাজ করছেন। ভাল কাজ করছেন। সমস্যা হল তারা, অপরিকল্পিতভাবে, ব্যাবসায়ীক মনভাব নিয়ে অনভিঙ্গের মত কাজ করছেন। তাদেরকে তো থামানো যাবেনা। কাজেই কাটা দিয়ে কাটা তুলতে হবে। সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে যে তারা ড্রেজিং করবে বেধে দেয়া নদী এলাকায় এবং কতটুকু করবে সেটাও মনিটরিং করতে হবে। কৃষিজমি থেকে কেউ পাথর/বালি তুলতে পারবে না।
যাই হোক লেখাটা অনেক বড় হয়ে গেল। এত বড় লেখা কেউ পড়তে চাইবে না। কিন্তু আরও অনেক কিছু ভাবনার ভেতরেই রয়ে গেল। ধন্যবাদ সবাইকে।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুলাই, ২০২৩ দুপুর ১২:২৭