রীতু ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললো “দ্যাখ, রঞ্জুদা খুব ভালো করে জানে আমি ওর জন্য পাগল, তাই আরও বেশি করে পাগল করছে আমাকে। ওর একটা অ্যাফেয়ার আছে, সেকথা পর্যন্ত সে আমার কাছে স্বীকার করেনি! ও ভেবেছে কি! শুধু সে আমাকে পাগল করতে পারে? আমি তাকে পাগল করতে পারি না!... (আবার ফোঁপানি)...
তখন সবেমাত্র আমরা এসএসসি লেভেলের বালিকা, কেমিস্ট্রি ক্লাস চলছিলো সেদিন। ঐ লেভেলে কেমিস্ট্রি তেমন ক্রিটিকাল কোনও বস্তু নয়, কিন্তু তাই বলে ক্লাসের মধ্যে এমন কান্নাকাটি... বাধ্য হয়ে বললাম, তুই ক্লাসে সিনক্রিয়েট করিসনা মা, যা করার বাইরে গিয়ে কর। রীতুর কষ্ট দেখে খারাপ লাগতো, আর আমি নিজে রঞ্জুদা লোকটাকে ঠিক চিনতাম না বলে সেভাবে কখনও ওকে মানা করতে পারিনি। সবসময় বলতাম, আরে ধুর, রঞ্জুদা তোকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরালেই হলো নাকি? তোর ভালোবাসার একটা মূল্য আছে না? ঐ পোলা যতই ঝামেলা করুক, তুই শুধু মান্না দে’র মত গেয়ে যাবি...
তুমি নয় না-ই কাছে আসলে, আমায় না-ই বা ভালোবাসলে
তাই বলে আমি কেন ভালোবাসবো না?...
আমি কেন কাছে আসবো না?
কি বিপুল বিশাল স্পর্ধিত উচ্চারণ! বয়স যত কমই হোক না কেন এটা ঠিকই বুঝতাম যে বাস্তবে মানুষ এভাবে পারে না, একতরফা ভালোবাসা এভাবে বয়ে বেড়ানো যায় না, এটা গল্পে কবিতায় গানে সম্ভব, রিয়াল লাইফে সম্ভব নয়... অথচ তাও কি পরিমাণ ভালো লাগতো গানটা শুনতে! আসলে এটা হচ্ছে কন্ঠস্বরের জাদু... স্বয়ং মান্না দে গেয়েছেন বলে কথা, ভালো না লেগে আর উপায় কি?
সেই বয়স থেকে শুরু মান্না দে কে নিয়ে পাগলামি, আজও যার সামান্যতম পরিবর্তনও হয়নি। ও, ভুল বললাম বোধহয়, পরিবর্তন হয়েছে, তবে শুধু বেড়েই গেছে, কমেনি। এরকমই আরও অজস্র গান আছে যেগুলো অনেক অনেক ভালো লেগেছে কিন্তু সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। কিছুদিন আগে আমার প্রোফাইলে মান্না দে’র ‘এরই নাম প্রেম’ গানটার কলি দেয়া ছিলো, অনেকেই লক্ষ্য করেছেন হয়তো, ওটাও সেরকমই একটা গান। শুনতে এত ইচ্ছে করে কিন্তু কোথায় পাবো বলুন? এই গানগুলো অনেক রেয়ার হয়ে গেছে এখন, ‘এবার ম'লে সুতো হবো তাঁতীর ঘরে জন্ম লবো ’ কিংবা ‘ললিতা ওকে আজ চলে যেতে বল না ’ গানগুলো পাওয়া যত সহজ, ‘এরই নাম প্রেম’ কিংবা ‘একি অপূর্ব প্রেম দিলে বিধাতা আমায়’ গানগুলো পাওয়া অত সহজ নয়। এরকমই ‘পাওয়া সহজ নয়’ আরেকটা গানের খানিকটা লিরিক শেয়ার করি (খুবই আফসোস হচ্ছে সুরটা শেয়ার করতে পারলাম না বলে)
কাল কিছুতেই ঘুম এলো না
ঐ চোখ, ঐ মুখ, ঐ মৃদু হাসিটি মন থেকে মোছা গেলো না।
আজকে যেভাবে হোক খুঁজবো তাকে
জানবো সে অপরূপা কোথায় থাকে
ভাল করে দেখবো সে চঞ্চলাকে... কেন তার নেই তুলনা?
এখন লিখতে বসে এরকম আরো অজস্র গান মনে পড়ে যাচ্ছে। সেই যে ‘বড় একা লাগে এই আঁধারে, মেঘেরও ছায়া আকাশ পারে ’ অদ্ভুত প্রশান্তিময় একটা গান, একা বসে চুপচাপ না শুনলে এই গানের আমেজটাই ধরা যাবে না। আবার খুব দুষ্টুমি মেজাযের গান আছে ‘চাঁদ দেখতে গিয়ে আমি তোমায় দেখে ফেলেছি/ কোন জোছনায় বেশি আলো এই দোটানায় পড়েছি ’... অথবা ‘বাঁচাও কে আছো মরেছি যে প্রেম করে’ । আচ্ছা উত্তম-সুচিত্রার ঐ ছবিটার নাম কি কেউ বলতে পারবেন যেখানে উত্তম হচ্ছেন আঁকিয়ে, তিনি কাঁধে রংতুলির ঝোলা ঝুলিয়ে ক্যানভাসের সুচিত্রার ছবি আঁকতে থাকেন আর সুচিত্রা দেবী ট্রে তে করে চা-নাশ্তা নিয়ে বাঁকা কোমর দুলিয়ে হেঁটে আসেন, তারপর ক্যানভাসের দিকে তাকিয়ে মরমে মরে যান, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে মান্না দে তুমুল গেয়ে ওঠেন ‘তোমার দেহের ভঙ্গিমাটি যেন বাঁকা সাপ/ পায়ে পায়ে ছড়িয়ে চলো যৌবনেরই ছাপ ’... এসনিপ্স থেকে খুঁজে পেতে আরও একটা ইন্টারেস্টিং গানের সন্ধান পেলাম, সেটা হলো যেমন সাপিনীকে পোষ মানায় ওঝা ।

আনন্দের বা মজার গানের পাশাপাশি অনেক স্যাড সং বা কষ্টের গানও আছে মান্না দে’র, সেগুলোও সমান চমৎকার। ‘যে ক্ষতি আমি নিয়েছিলাম আমি নিয়েছিলাম মেনে/সেই ক্ষতি পূরণ করতে কেন এলে? কি খেলা তুমি নতুন করে যাবে আবার খেলে? ’... তারপর ‘আমি ফুল না হয়ে কাঁটা হয়েই বেশ ছিলাম ’... কিংবা ‘ক’ফোঁটা চোখের জল ফেলেছো যে তুমি ভালোবাসবে?/ পথের কাঁটায় পায়ে রক্ত না ঝরালে কি করে এখানে তুমি আসবে?’ (কি সুতীব্র শ্লেষ! ঠিক কতখানি ভালোবাসলে এমন তীব্র শ্লেষে তা উচ্চারণ করা যায়?)। আরও আছে ‘তুমি আর ডেকো না, পিছু ডেকো না/ আমি চলে যাই, শুধু বলে যাই, তোমার হৃদয়ে মোর স্মৃতি রেখো না...’ এটাও অনেক কষ্টের একটা গান। তারপরে আছে ‘সে আমার ছোটবোন, বড় আদরের ছোটবোন ’ (এই গানটা আমি পারতপক্ষে শুনি না, খুব কষ্ট হয় শুনলে, নিজের ছোটবোনকে খুব ভালোবাসি আর সে খুব ভালো গান গায় বলেই কিনা কে জানে)। তারপর ধরুন ‘আবার হবে তো দেখা, এ দেখাই শেষ দেখা নয় তো?/ কি চোখে তোমায় দেখি বোঝাতে পারিনি আজও হয়তো...’
কিছু কিছু গান নিয়ে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে গেছে। বাবাকে দেখতাম ‘সবাই তো সুখী হতে চায় ’ গানটা শুনলে কেমন যেন নস্টালজিক আর স্বপ্নালু হয়ে যেতেন। আমার বন্ধু অরিত্র, মান্না দে’র গাওয়া ‘খুব জানতে ইচ্ছে করে/ তুমি কি সেই আগের মতই আছো, নাকি অনেকখানি বদলে গেছো ’ গানটা খুব পছন্দ করতো, প্রায়ই বলতো- একবার গা তো গানটা! এরকমই একদিন অরিত্র গাইতে বলেছে, আমিও গেয়ে যাচ্ছি, অন্যসব বান্দর পোলামাইয়াগুলা ‘কি প্যানপ্যানানি প্রেমের গান রে বাবা!’ বলে হাসাহাসি শুরু করে দিলো, এক ফাঁকে ওদের হাহাহিহি দেখে আমিও একটু হেসে ফেলেছিলাম বোধহয়, আর অরিত্র’র সে কি রাগ! ‘তুই আমার এত প্রিয় একটা গানকে এভাবে রেপ করে ছেড়ে দিলি... তুই পারলি?... থাক, আর গাইতে হবে না, যথেষ্ট হয়েছে!!!’ আমি একেবারে বোকা হয়ে গিয়েছিলাম ওর রাগ দেখে।... একটা সময় ছিলো যখন ২বোন একসাথে বেণী দুলিয়ে স্কুলে যেতাম আর গলা মিলিয়ে ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই ’ গানটা গাইতাম, আসলে গাইতে মজা লাগতো কারণ এতবড় একটা গান, সবগুলো কথা ঠিকমত মনে থাকতো না, কাজেই কার কতটুকু মনে আছে আর কে কতটুকু ভুলে গেছে এই নিয়ে চুলোচুলি করার মধ্যেই বেশি আনন্দ ছিলো।

আমার দ্বিতীয় মায়ের খুব প্রিয় ছিলো 'শুধু একদিন ভালোবাসা মৃত্যু যে তারপর তাও যদি পাই, আমি তাই চাই/ চাইনা বাঁচতে আমি প্রেমহীন হাজার বছর ... এই গানটা আমি চিনতাম না, তার কাছ থেকেই আমার এই গানটার সাথে প্রথম পরিচয়। এরকম আরো একটা গান আছে, খুব তীব্র রোমান্টিক: 'আমার একদিকে শুধু তুমি পৃথিবী অন্যদিকে/ এদিকে একটি একটি প্রদীপ, সূর্যটা ওদিকে, আমি তোমারই দিকটা নিলাম ' এই গানটা না শুনলে আসলেই অনেক বড় মিস হয়ে যেত।
কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই গানটার একটা বর্তমান এবং আধুনিক ভার্শন বেরিয়েছে আমি জানতাম না, জানানোর এবং লিঙ্ক দেয়ার কাজটা করেছেন আমাদের রাতমজুর আঙ্কেল।




অনেক গানের কথা বললাম, তাও আরও অনেক অনেক গান বাকি রয়ে গেলো। এই মুহুর্তে মনে পড়ছে খুবই মেলোডিয়াস আরও দু'টো ট্র্যাক এর কথা--- একটা হচ্ছে 'আমি যে জলসাঘরের বেলোয়ারি ঝাড় ' আর আরেকটা হচ্ছে 'আমি যামিনী তুমি শশী হে, ভাতিছো গগন মাঝে ' - সারাজীবন শুনলেও পুরনো হবে না, গানগুলো এমনই। পাঠকদেরকে অনুরোধ করবো তাদের পছন্দগুলোও শেয়ার করতে, আর লিঙ্ক পেলে দিয়ে দিতে। আর বাংলা গানের মত হিন্দি ভাষায়ও মান্না দে’র অজস্র সুন্দর সুন্দর গান আছে, তার মধ্যে থেকে আমার খুব পছন্দের কয়েকটি তুলে দিলামঃ
১. কৌন আয়া মেরে মন কে দুয়ারে পায়েল কি ঝঙ্কার লিয়ে ('দেখ কবিরা রোয়া' মুভি থেকে, বড়ই মধুর সঙ্গীত)
২. এক চতুর নার ('পাড়োসান' মুভি থেকে, এক্কেবারে দম ফাটানো হাসির একটা গান- যেমন কথা তেমন সুর আর ঠিক তেমনি কোরিওগ্রাফি, মান্না দে আর কিশোর কুমারের ডুয়েট, মুভি যদি হয় মাস্ট সি, তাহলে আমি বলবো এটা আ মাস্ট লিসেন সং!)। গানটির ভিডিও লিঙ্ক দিয়েছেন জিরো আরণ্যক দা ।

৩. জিন্দেগি ক্যায়সি হ্যায় পহেলি হায় ('আনন্দ' মুভি থেকে) এই গানটার কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, নুশেরা আপা মনে তো করিয়ে দিয়েছেনই, সাথে ইউটিউব লিঙ্কটাও দিয়ে দিয়েছেন ।

৪ লাগা চুনরি মে দাগ (নুশেরা আপা ও মনজুরুল ভাইয়ের সৌজন্যে)

বাংলা মিউজিক ডট কম থেকে মান্না দে'র গানের মোটামুটি ভালো একটা কালেকশন পেলাম তাই সেই লিঙ্কটাও দিয়ে দিচ্ছি এখানে, আশা করি সবগুলোই ভালো লাগবে, বিশেষ করে 'সেই তো আবার কাছে এলে/এতদিন দূরে থেকে বলো না কি সুখ তুমি পেলে ?' গানটা তো না শুনলেই নয়! (এটা কিন্তু মান্না দে'র নিজের সুর করা গান)

১. কফি হাউজের সেই আড্ডাটা
২. মিষ্টি একটা গন্ধ
৩. সব তোমারই জন্য
৪. সুপার হিটস
সবশেষে উত্তম কুমার-তনুজা জুটির অমর ছবি ‘এন্টনি ফিরিঙ্গি’র ‘চম্পা চামেলি গোলাপের বাগে/ এমন মাধবী নিশি আসেনি তো আগে’ গানটার একটা ভিডিও দিয়ে দিলাম, এই গানটি হচ্ছে মান্না দে’র কন্ঠসুধার আরেক মাইলফলক উদাহরণ, আর সাথে বোনাস হিসেবে গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সুরের মাধুরী আর উত্তম-তনুজার অনস্ক্রীন রোমান্স তো থাকছেই!

সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১:৪৯