আজ দুপুর বারটার কিছু আগে বা পরে দেখি, সেলফোন থেকে সামহোয়্যারইনব্লগে খুব সহজেই, কোন বিকল্প পদ্ধতি ছাড়াই, প্রবেশ করতে পারছি। পরে ল্যাপটপ খুলে দেখি, সেখান থেকেও ব্লগে প্রবেশ নির্বিঘ্ন, বাধাহীন। এরকম অবশ্য এর আগেও বেশ কয়েকবার হয়েছে, তাই ব্যাপারটাকে তেমন গুরুত্ব দিলাম না। দুপুরে যোহরের নামায পড়ে এসে চেক করে দেখলাম, প্রবেশাধিকার তখনো উন্মুক্ত। ব্লগার কাওসার চৌধুরী ব্লগের ফেইসবুক গ্রুপে একটা পোস্ট দিয়ে জানালেন, তিনি আজ স্বাভাবিক পন্থায় ব্লগে প্রবেশ করতে পেরেছেন, আমারই মত।
মধ্যাহ্নভোজের পর আবার এসে দেখি, তখনো সহজেই প্রবেশ করা গেল। এবারে লক্ষ্য করে দেখলাম, ব্লগে তখন অন লাইনে আছেন ৪০ এর উপর, যা এতদিন ঐ সময়ে ৩০ এর নীচে থাকতো। একটু পর থেকেই ব্লগে এবং ফেইসবুকে একে একে পোস্ট আসতে শুরু করলো, পোস্টদাতারা সবাই নির্বিঘ্নে ব্লগে প্রবেশ করতে পারছেন। সবাই এতে উৎফুল্ল, আনন্দে বিহ্বল। পোস্টের সংখ্যা যেমন বাড়তে থাকলো, মন্তব্যের সংখ্যাও তেমনি। ধীরে ধীরে তা জয়ধ্বনিতে রূপ নিতে থাকলো, ব্লগে আনন্দ বন্যা বইতে শুরু করলো। সবার এই আনন্দ দেখে আমিও আনন্দিত বোধ করতে শুরু করলাম। একে একে সবার পোস্ট, সবার মন্তব্য পড়ে সে আনন্দে সামিল হ’লাম। যতই পড়তে থাকি, ততই আনন্দে আপ্লুত হতে থাকি। গানের চরণে চরণে প্রকাশিত কয়েকজনের শৈল্পিক আনন্দ উচ্ছ্বাস দেখে খুবই ভাল লাগতে থাকলো। মনে হচ্ছিল, এত দিনের আটকে রাখা উচ্ছ্বাস, উৎকন্ঠা, শঙ্কা, অপবাদের অংশীদার হওয়ার গ্লানি এবং অপমানবোধ, ইত্যাদি বহুবিধ অনুভূতি যেন এক্ষণে একটি মাত্র অনুভূতি- “আনন্দে” রূপান্তরিত হয়ে বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
ব্লগ উন্মুক্ত হবার পর পরই ব্লগার হাসান মাহবুব এর একটি সংক্ষিপ্ত পোস্টে এসে ব্লগজননী সৈয়দা গুলশান আরা ফেরদৌস জানা নিম্নোক্ত মন্তব্যটি রেখেছেনঃ
“অনেকেই নিজের ঘরে কোন বাধা ছড়াই প্রবেশ করতে পারছেন জেনে আমারও খুব ভাল লাগছে। তবে, আমাদের আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। আমি গণমাধ্যম গুলো এবং প্রভাইডারদের সাথে যোগাযোগ করছি। খুলে দিয়ে থাকলে সেটা অবশ্যই গণমাধ্যমে আসা উচিত। বিটিআরসি এবং মাননীয় মন্ত্রীকে ইন্টারভিউ করে বন্ধ এবং খোলার কারণ জানানো উচিত। এটা হলো আমার পেশাদারিত্ব। আমি খুব সাধারণভাবেই এর যত্ন করি। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আমিও যোগ দেবো সবার আনন্দে। আমাকে আর একটু সময় দিন সবাই"।
খুবই যুক্তিসম্মত এবং ন্যায়সঙ্গত এ দাবী। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বিশ্বের সর্ববৃহৎ এ ব্লগটিকে, যেখানে লক্ষ লক্ষ বাংলা ভাষা ভাষী প্রতিদিন ঘন্টায় ঘন্টায় বহু পোস্ট লিখতেন, রক্তে অর্জিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মাস, বাঙালীর আত্মমর্যাদার মাস গত ফেব্রুয়ারী মাসে অতি সন্তর্পণে কোন জনবিজ্ঞপ্তি ছাড়াই পর্ণোগ্রাফীর মিথ্যে অভিযোগ টেনে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ঠিক তেমনি করেই আজ আবার তা কোন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই চুপিচুপি উন্মুক্ত করে দেয়া হলো। কাজেই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসার মাধ্যমে এর কারণগুলো জনস্বার্থে গণমাধ্যমে প্রকাশ করার দাবীটা একটা নায্য দাবীই বটে।
যাই হোক, ব্লগটি অপশাসন থেকে মুক্ত হয়েছে, এটাই এখন একটা বড় স্বস্তির বিষয়। শুভবুদ্ধির এ জাগরণ আরো বিকশিত হোক, প্রশাসনের সর্বক্ষেত্রে প্রসারিত হোক, দেশের একজন সুনাগরিক হিসেবে এটাই এখন আমাদের প্রত্যাশা। তবে এ ব্যাপারে আমাদেরও কিছু করণীয় আছে। সকল ব্লগারদেরকে সতর্ক থাকতে হবে, যেন তাদের পোস্টে কেউ অশ্লীল কোন ছবি মন্তব্যের ঘরে পোস্ট করতে না পারে। করলে কর্তৃপক্ষের নিকট দ্রুত অভিযোগ উল্থাপন করে তৎক্ষনাৎ তা মুছে ফেলতে হবে। ব্লগ পরিচালকদেরকেও এ ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকতে হবে এবং কোন অভিযোগ পাওয়া মাত্রই তাদেরকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। সাধারণতঃ এসব ঘটনা বাংলাদেশের স্থানীয় সময় গভীর রাতে ঘটার সম্ভাবনা বেশী থাকে। তাই গভীর রাতে অন্ততঃ একজন মডারেটরকে পালাক্রমে খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজন বোধে মডারেটরের সংখ্যাও বাড়ানো যেতে পারে।
ব্লগারদেরকে তাদের পোস্টের কনটেন্ট এবং মন্তব্য/প্রতিমন্তব্যের পূর্ণ দায়িত্ব নিতে হবে। চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলে তাদেরকে যথাযথ সাক্ষ্য প্রমাণসহ নিজ বক্তব্যকে স্বচ্ছতার সাথে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। পোস্টে এবং মন্তব্য/প্রতিমন্তব্যে সরাসরি ব্যক্তি আক্রমণ বা বিদ্বেষমূলক কোন কথাবার্তা থেকে বিরত থাকতে হবে। আলোচনা সমালোচনা অবশ্যই করা যেতে পারে, কিন্তু তা যেন কোনক্রমেই ব্যক্তি আক্রমণে পরিণত না হয়, কোন হুমকি হিসেবে পরিগণিত না হয়। বিশেষ করে ধর্মীয় কোন বক্তব্য বা মন্তব্য প্রকাশ কালে এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, তা যেন অন্য ধর্মীয় মতবাদে বিশ্বাসী কোন সম্প্রদায়কে আহত না করে। এসব কথা ব্লগীয় নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত আছে বলে আমার বিশ্বাস, তবুও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যেন আমরা নতুন কোন অপবাদের শিকার না হই।
এ মুহূর্তে ব্লগে অন লাইনে রয়েছেন ৫৫ জন ব্লগার, ভিজিটর ৯১৭ জন, ৭৭১ জন মোবাইল থেকে। এ সময়ে এরকম পরিসংখ্যান ব্লগ ব্লক হবার পর থেকে দেখা যায়নি। কাজেই এটা ব্লগারদের জন্য একটি আনন্দ সংবাদ। মুখে মুখে কথা ছড়িয়ে যাচ্ছে। যারা এতদিন প্রবেশাধিকার না পেয়ে ব্লগ থেকে দূরে ছিলেন, তারা আবার ফিরে আসছেন। অনেকেই আবার ইতোমধ্যে তাদের পাসওয়ার্ড হারিয়ে ফেলেছেন। তারা ফীডব্যাক ঠিকানায় গিয়ে/ ফেইসবুক পেইজে পোস্ট/মন্তব্যের মাধ্যমে তাদের পাসওয়ার্ড ফিরে পাবার ব্যাপারে মডারেটরের সাহায্য কামনা করছেন। মডারেটরও যথাসম্ভব সাহায্য করে চলেছেন, ইনবক্স বার্তার ভারে তার ইনবক্স সহজে খুলছেনা বলে তিনি জানিয়েছেন। সবাই খুশীর সাথেই ধৈর্য ধারণ করে অপেক্ষা করছেন, এটাও একটা বড় স্বস্তির কথা। আশাকরি, আগামী দু’তিন দিনের মধ্যে ব্লগ আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাবে। আসুন, আমরা সবাই মিলে, ইতোমধ্যে অনেক নতুন যোগ হওয়া ব্লগারদের নিয়ে, নতুন-পুরাতন-অতি পুরাতন সবাই মিলে নতুন নতুন পোস্ট লিখে ব্লগকে সমৃদ্ধ করে তুলি। দেশকে নিয়ে ভাবি, দেশের সমস্যা নিয়ে, জনগণের সমস্যা নিয়ে ভাবি ও লিখি, সেই সাথে কিছু সাহিত্য-শিল্প চর্চাও করি, গান-গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ-নিবন্ধ-কথিকা লিখি, বেড়িয়ে আসা দেশ নিয়ে ভ্রমণ কাহিনী লিখি, প্রবাসীরা তাদের মজার মজার অভিজ্ঞতার কথা লিখি, এবং অতি অবশ্যই, সচেতনতার সাথে, নির্মোহভাবে চলমান রাজনীতির গতি প্রকৃতি নিয়েও লিখি। যার যে যে বিষয় পছন্দ তিনি সেই সব বিষয় নিয়ে লিখবেন, পড়বেন এবং মন্তব্য করবেন।
সবাইকে শুভকামনা, এবং ব্লকমুক্তির অভিনন্দন! ভাল থাকুন প্রত্যেকেই।
ঢাকা
২৩ অক্টোবর ২০১৯
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে অক্টোবর, ২০১৯ দুপুর ১:৫৬