ইস্তান্বুলের অলি-গলিতে কয়েকটা দিন - প্রথম পর্ব
সেই রাতদুপুরে উঠে তৈরী হয়ে এয়ারপোর্টে আসতে হয়েছে। তারপর চার ঘন্টার ফ্লাইট, ড্রাইভারের ভেল্কিবাজী, সন্ধায় হাটাহাটি ইত্যাদির পরও রুমে এসে ইচ্ছা ছিল সারাদিনের একটা সংক্ষিপ্ত কড়চা লিখে ফেলা। কিন্তু মন ভাবে একটা, শরীর ভাবে আরেকটা। বিছানায় একটু শরীর এলিয়ে দিয়ে ভাবলাম, একটু পর উঠে ফ্রেশ হয়ে লিখবো কিন্তু কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, নিজেও জানিনা। সারাদিনের বাসি পোশাকও ছাড়া হয়নি। ঘুম ভাঙলো কাকডাকা ভোরে পাখির কিচির-মিচির শব্দে। চোখ মেলে প্রথমেই একটু চমকে গেলাম, সবকিছু অপরিচিত লাগে কেন? পরমূহুর্তেই মনে পড়লো আমি আমার চির-পরিচিত শোবার ঘরে না, একটা হোটেলের রুমে, ইস্তান্বুলে!
সারা রাত ঘুমে একেবারে অচেতন ছিলাম। আবার ঘুমানোর চেষ্টা করে বুঝলাম এখন আর ঘুম আসবে না। অগত্যা উঠে পড়লাম। বারান্দায় এসে দাড়ালাম। মর্মর সাগর থেকে উঠে আসা মৃদুমন্দ বাতাসে মূহুর্তেই ঝিমানো ভাবটা কেটে গেল। ভোরের খালি পেটের বদঅভ্যাস, অর্থাৎ চা-পানটা বারান্দায় দাড়িয়েই সেরে ফেললাম। দারুনভাবে উপভোগ করলাম সময়টা। আগামী কয়েকটা দিন কাজের কোন চাপ নাই, তাড়াহুড়া বা টেনশানও নাই। নাই কোন রুটিন ওয়র্ক। মুক্ত স্বাধীন আমি শুধু ঘুরে বেড়াবো, যখন-তখন, যেখানে ইচ্ছা সেখানে। ভাবতেই মনটা ফুরফুরে হয়ে গেল।
ব্রেকফাস্ট সার্ভ করবে সকাল আটটা থেকে দশটা পর্যন্ত। এখন বাজে মাত্র সাড়ে পাচটা। ফ্রেশ হয়ে বাইরে আসলাম, ইচ্ছা আশপাশটা একটু ঘুরে দেখা। আমি আছি ইস্তান্বুলের ইউরোপিয়ান সাইডে, পুরানো শহরে। মূল দর্শনীয় স্থানগুলোর বেশীরভাগের অবস্থান আশে-পাশেই। উচু-নীচু সরু সরু রাস্তা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। রাস্তায় পাথরের ব্লক বসানো, ঠিক যেমনটা বিভিন্ন ইউরোপিয়ান শহরের পুরাতন অংশে দেখা যায়। ইউরোপের সাথে একটাই পার্থক্য, তা হলো বেশীরভাগ বাড়ীর মূল দরজায় আরবী লেখা, পবিত্র কোরান শরীফের আয়াত হওয়ারই সম্ভাবনাই বেশী।
হাটতে হাটতে মিনিট দশেকের মধ্যেই প্রথম ধাক্কাটা খেলাম! একটা বাড়ীর সামনের এক চিলতে শেডের নীচে মেঝেতে একলোক তার দুই ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে আছে, সিরিয়ান শরনার্থী! ভদ্রলোক উঠে এসে আরবীতে কথা বলা শুরু করলো, তারপর আমি কিছুই বুঝতে পারছি না তা বুঝতে পেরে আকারে-ইঙ্গিতে সাহায্য চাইলো। জিজ্ঞেস করলাম, এদের মা কোথায়? আমার কথা কতোটুকু বুঝলো জানিনা, আরবীতে যা বললো আমিও তা বুঝলাম না। কিছু টাকা দিয়ে মেয়ে দু-টার মাথায় হাত বুলিয়ে চলে এলাম। মেয়ে দুটার এতো মায়া মায়া চেহারা, দেখে আমার চোখে পানি চলে আসলো। ওরা কেমনভাবে আমার দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিল আপনাদেরকে বোঝাতে পারবো না। খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম। এখনও ওদের চেহারা আমার চোখে ভাসে!
এতোদিন টিভিতে আর খবরের কাগজে এদের দেখেছি, এই প্রথম সামনা-সামনি দেখা। রাস্তায় এমনিভাবে আরও কয়েকজনের দেখা মিললো। আস্তে আস্তে শহর জেগে উঠছে। বুঝলাম বাকী কয়েকটা দিন আমাকে বারে বারে এই কঠিন বেদনাদায়ক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। মনটা খারাপ করেই হোটেলে ফিরে এলাম। হোটেলের রিসিপশানে যে ছিল সে তাজাকিস্তান থেকে এসেছে। সব শুনে বললো, ’সাহায্য করছো ভালো কথা! কিন্তু অনেক তুর্কিও এই সুযোগে সিরিয়ান সেজে ট্যুরিস্টদের থেকে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিচ্ছে। কাজেই সাহায্য করার আগে দেখবে আরবীতে কথা বলছে কিনা, আর সিরিয়ান পাসপোর্ট আছে কিনা?’ কি যন্ত্রনা, সাহায্য করাও মুশকিল!
আজকের প্রধান প্রোগ্রাম হলো, বসফোরাস প্রনালীতে ক্রুজিং। সকাল সাড়ে ন’টায় ট্যুর কোম্পানীর গাড়ী আসবে, তুলে নেয়ার জন্য। ক্রুজিং শেষে আবার হোটেলে নামিয়ে দিবে। নাস্তা করে, রেডি হয়ে সোয়া ন’টায় নীচে নামলাম। গাড়ী আসলো পৌনে দশটার সময়। গাড়ীতে উঠে দেখি আর কেউ নাই। জিজ্ঞেস করাতে বললো, আমিই প্রথম পিক, বাকীদেরকে তুলবে এখন। শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন দেশের ট্যুরিস্ট তুলে সাড়ে এগারোটার সময় ঘাটে নামিয়ে দিল। এই পুরো সময়টা গাড়ীতে বসা, বিরক্তিকর! নিজেকে সান্তনা দিলাম, যাক, শহরটা তো দেখা হলো!
যাদের ইস্তান্বুল যাওয়ার ইচ্ছা আছে তাদেরকে বলছি, একগাদা টাকা খরচ করে এই ক্রুজিংয়ে না যাওয়াই ভালো প্রথমে। এমন আহামরি কিছু না। ইওরোপ থেকে এশিয়ান অংশে যেতে এমনিতেই আপনাকে বসফোরাস পাড়ি দিতে হবে, ক্রুজিং ওখানেই অনেকটা হয়ে যায়। ফেরীতে বিভিন্ন জায়গায়ও যেতে পারেন একদম কম খরচে। ট্রাভেল কার্ড করে নিবেন আর দরকারমতো টপ আপ করবেন। এতে বাস, ট্রাম, ফেরী, মেট্রো সবই কাভার করে। তারপরও যদি ইচ্ছা করে, শেষের দিকে যান। আর গেলে হোটেল থেকে না গিয়ে সরাসরি ঘাটে গেলে সময়, টাকা দু’টাই বাচে। যাক, আবার আমার ক্রুজিংয়ে ফিরে যাই।
ক্রুজিংয়ের বাহন হচ্ছে মাঝারী সাইজের একটা লন্চ। উপরে খোলা ডেকে বসার যায়গা। নীচেও বসা যায়, তবে সেটা খোলা না, দু’পাশে সার দিয়ে ছোট ছোট জানালা। আমাদের দেশের লন্চ আরকি! নীচে এক কোনায় চা-কফি, স্ন্যাক্সের একটা ছোট্ট কাউন্টার। বিকট শব্দে টার্কিশ গান বাজছে, মাঝে-মধ্যে ২/১ টা ইংলিশ। প্রায় ঘন্টাখানেক চলার পর আবার এক ঘাটে থেমে আরো পর্যটক তুললো। শেষমেষ দুপুর একটা নাগাদ মূল ক্রুজিং শুরু হলো। বেশিরভাগ সময়ই গান বাজলো, মাঝে-মধ্যে ধারা-বর্ননা, তারও কিছুটা টার্কিশ ভাষায়, কিছুটা ইংলিশে। তবে, দুপাশের দৃশ্য আসলেই অসাধারন। এতক্ষনে উত্তেজনা অনুভব করলাম, কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস-সমৃদ্ধ বসফোরাসের বুকে আমি ভেসে বেড়াচ্ছি! পানিতে দেখলাম অসংখ্য জেলিফিস, এতো জেলিফিস ভাসতে আমি কোথাও দেখিনি।
ভাসতে ভাসতে দু’পাশের অপূর্ব দৃশ্য এবং একে একে দুই অংশের কিছু বিখ্যাত স্থাপনা দেখলাম। এর একদিকে এশিয়া, একদিকে ইওরোপ! দু’পাশের অর্থাৎ ইওরোপ-এশিয়ার কয়েকটা দৃশ্য,
বসফোরাস প্রনালী কালো সাগর (ব্ল্যাক সী) আর মর্মর সাগরকে সংযুক্ত করেছে। বসফোরাস এবং মর্মর সাগরের সংযোগস্থল,
ইউরোপ অংশে অবস্থিত রুমেলী হিসারি দূর্গ। এখানে আমরা কিছু সময়ের জন্য নেমেছিলাম। প্রথম ছবিটা বসফোরাস থেকে নেয়া, পরের দু’টা দূর্গের উপর থেকে নেয়া।
আড়াইটার দিকে একঘন্টার জন্য আমাদেরকে এশিয়ান সাইডে নামিয়ে দিল দুপুরের খাবার খাওয়া, আর একটু ঘুরে বেড়ানোর জন্য।
২য় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহার করা মার্কিন সাবমেরিন ইউ এস এস থর্নব্যাক। ১৯৭১ এ টার্কিশ নেভিতে যুক্ত হয় ’টিসিজি উলুজ আলী রেইস’ নামে। বর্তমান অবস্থান বসফোরাসের গোল্ডেন হর্ণে রাহমী এম. কজ মিউজিয়ামে।
এশিয়ান অংশের কাছে মেইডেন টাওয়ার। খুবই ছোট্ট একটা দ্বীপে এটি ১১১০ খৃষ্টাব্দে স্থাপন করা হয়। বর্তমানে এখানে একটা রেস্টুরেন্ট আছে।
বসফোরাস থেকে দেখা দোলমাবাহচে প্রাসাদ। ১৮৪৩ সালে এর কাজ শুরু হয়ে ১৮৫৬ সালে শেষ হয়। নির্মান শেষে টপক্যাপির পরিবর্তে এটাকে সুলতানের বাসস্থান হিসাবে ব্যবহার করা শুরু হয়।
ক্রুজিং শেষ করে আমি হোটেলে ফেরার জন্য ওদের বিরক্তিকর রাইডে না গিয়ে এমিনন্যু (একটা জেটি, এখান থেকে এশিয়ান সাইডে যাওয়ার ফেরী ছাড়ে) তে নেমে পড়লাম। হোটেলের রিসিপশনিস্ট বলেছিল ওখানকার ফিস স্যান্ডউইচের স্বাদ নাকি অতুলনীয়, আর ওখান থেকে স্পাইস মার্কেট ও একদম কাছে।
একটু লম্বা কিসিমের রুটির মধ্যে একটা সেদ্ধ ম্যাকারেল ফিলে আর একটু সালাদ দেয়া। নাম বালিক একমেক (বালিক - মাছ, একমেক - রুটি), আমার বাঙ্গালী রসনাকে একেবারেই তৃপ্ত করতে পারে নাই, জঘন্যর থেকে একটু ভালো। ম্যাকারেল এমনিতে আমার অন্যতম প্রিয় মাছ, তাই 'একটু ভালো' লাগলো। একটাই ভালো দিক; মাছগুলো একেবারেই ফ্রেশ, ওখানেই ধরা হয়।
স্পাইস মার্কেট আমাদের পুরানো ঢাকার চকবাজারের টার্কিশ ভার্সান। মূলতঃ বিভিন্ন রকমের মশলাপাতি, বাদাম, টার্কিশ ডেলাইট, ডেকোরেশান পিস ইত্যাদি বিক্রি হয় এখানে। খুব একটা মজা পাইনি ঘুরে, তাই ছবিও তুলি নাই। কিছুক্ষন ঘোরাঘুরি করে ফিরে গেলাম হোটেলে।
ছবিঃ আমার ক্যামেরা, ফোন।
তথ্যঃ বিবিধ।
ইস্তান্বুলের অলি-গলিতে কয়েকটা দিন - তৃতীয় পর্ব
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মে, ২০২০ দুপুর ১:৩৯