অনেকেই 'ব্যাখ্যা' আর 'প্রমাণ' এর মধ্যে পার্থক্য বোঝেন না। কেউ কেউ দেখা যায় বুঝে বা না বুঝে প্রায়শই কোনো কিছুর ব্যাখ্যাকে 'প্রমাণ' হিসেবে চালিয়ে দেন। অনেকে আবার 'প্রমাণ' বলতে ঠিক কী বুঝায় সেটাও বোঝেন না। যেমন তাদেরকে প্রায়শই দাবি করতে শোনা যায় – এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার পক্ষে কোনোই প্রমাণ নেই! এই কথা বলে নিজেদেরকে 'যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনষ্ক' হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাদেরকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় কী ধরণের প্রমাণ পেলে তারা স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করবেন এবং কেনো – তখন পিছুটান দেয়া হয়!
যাহোক, ব্যাখ্যা আর প্রমাণ যে এক জিনিস নয় সেটি দু-একটি উদাহরণের সাহায্যে বুঝানো যাক।
- কেউ ইচ্ছে করলে এক মাথা, দুই হাত, এবং দুই পা ওয়ালা মানুষ থেকে কীভাবে অন্ধ-অচেতন ও উদ্দেশ্যহীন প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তিন মাথা, সাত হাত, তের পা, এবং দুই লেজ ওয়ালা কিম্ভূতকিমাকার জন্তু বিবর্তিত হতে পারে – তার উপর ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে ব্যাখ্যা দিতে পারেন। অনুরূপভাবে, সরাসরি ডিম দেয়া অস্তন্যপায়ী কোনো প্রজাতি থেকে কীভাবে অন্ধ-অচেতন ও উদ্দেশ্যহীন প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বাচ্চা দেয়া স্তন্যপায়ী প্রজাতি বিবর্তিত হতে পারে – সে বিষয়েও ব্যাখ্যা দিতে পারেন। তার এই 'ব্যাখ্যা' শুনে কেউ কেউ হয়ত সেটিকে 'বৈজ্ঞানিক প্রমাণ' হিসেবে বিশ্বাসও করতে পারেন, যেমন অনেকেই করছেন। কিন্তু এটি মোটেও কোনো প্রমাণ নয় – স্রেফ মনগড়া ব্যাখ্যা। এভাবে মনগড়া ব্যাখ্যার মাধ্যমে যাচ্ছেতাই 'প্রমাণ' করা সম্ভব।
- ধরা যাক কোনো এক ভিনগ্রহ থেকে অত্যন্ত উন্নতমানের একটি মেশিন এই পৃথিবীতে পাঠানো হলো। মেশিনটি কে বা কারা পাঠিয়েছে সেটি এই গ্রহের কেউই বলতে পারেন না। পৃথিবীবাসীর কাছে মেশিনটি সম্পূর্ণ নতুন – পরিচিত কোনো মেশিনের সাথে মিল নেই। মেশিনটির কার্যপ্রণালীও কেউ জানেন না। এমনকি মেশিনটি কেউ তৈরী করেছে কি-না – সে বিষয়ে পৃথিবীবাসীর মধ্যে মতবিরোধ আছে। এবার মেশিনটিকে নাসা'র একটি ল্যাবে পাঠানো হলো। একদল বিজ্ঞানী মেশিনটি নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। মেশিনের প্রত্যেকটি অংশ খুলে তার কার্যপ্রণালী বোঝার চেষ্টা করলেন। এভাবে ধীরে ধীরে বিজ্ঞানীরা একদিন পুরো মেশিনের কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হলেন। কিন্তু তার মানে কি প্রমাণ হবে যে সেই মেশিনটির কোনো মেকার নাই? উত্তর হচ্ছে, মোটেও না। একটি মেশিনের কার্যপ্রণালী কোনো ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারা বা জেনে যাওয়া মানে এই নয় যে সেই মেশিনের কোনো মেকার নাই। অথচ নাস্তিকদের বিশ্বাস অনুযায়ী এই 'কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা'-ই হচ্ছে মেশিনটির মেকার না থাকার পক্ষে 'বৈজ্ঞানিক প্রমাণ'! এমনকি প্রফেসর ডকিন্সও একই 'যুক্তি'-তে বিশ্বাস করেন!
- ট্রিনিটি অনুযায়ী "ফাদার একজন গড, সান একজন গড, এবং হলিঘোস্ট একজন গড; কিন্তু তিনজন আলাদা গড নয়, একজন গড।" ট্রিনিটিতে বিশ্বাসীরা এটিকে বিভিন্নভাবে 'ব্যাখ্যা' করার চেষ্টা করেন। যেমন তারা কখনো 'ডিম' কখনো 'আপেল' কখনো 'বরফ' কখনো বা আবার 'ত্রিভুজ' এর উদাহরণ নিয়ে এসে ব্যাখ্যা দেন। কিন্তু তাদের এই 'ব্যাখ্যা' স্রেফ ব্যাখ্যা হিসেবেই থেকে যায় – কোনো প্রমাণ নয়। অধিকন্তু, যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে যেহেতু বাস্তবে এমন কিছুর অস্তিত্ব থাকতে পারে না সেহেতু কোনো উদাহরণই ধোপে টেকে না।