এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার অনস্তিত্ব যেহেতু কোনো কালেই কেউ প্রমাণ করতে সক্ষম হবে না এবং বেশীরভাগ মানুষ যেহেতু স্রষ্টায় বিশ্বাসী এবং তাদের বিশ্বাসের স্বপক্ষে যেহেতু শক্তিশালী যুক্তিও আছে সেহেতু স্রষ্টাকে একটি “প্রতিষ্ঠিত সত্য” হিসেবে ধরে নেয়া যেতে পারে। তাছাড়া যৌক্তিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই মহাবিশ্বের একজন স্বজ্ঞাত ও বুদ্ধিমান স্রষ্টা থাকা অত্যন্ত জরুরী।
বুদ্ধিমান স্রষ্টার উপর নাস্তিকদের আবার বেশ ক্ষোভ! ঘর পোড়া গরুর মতো ‘বুদ্ধিমান’ শব্দটা শুনলেই তারা আঁতকে ওঠেন! তার কারণ হচ্ছে বুদ্ধিমান স্রষ্টা যেমন ন্যায়-অন্যায়ের হিসাব-নিকাস রাখতে সক্ষম তেমনি আবার অপরাধীদের জন্য শাস্তির ব্যবস্থাও থাকতে পারে। অন্যদিকে বোবা-কালা-অন্ধ-অচেতন প্রকৃতি যেহেতু ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করতে অক্ষম সেহেতু এই ধরণের প্রকৃতি গডে বিশ্বাসের মজাই আলাদা! চুরি-চামারি-হত্যা-ধর্ষণ সহ যে কোনো প্রকারের অপরাধ করে সহজেই পার পাওয়া যাবে।
আস্তিকদের বিশ্বাস অনুযায়ী আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সবারই একদিন-না-একদিন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার হবেই। একমাত্র যুদ্ধাপরাধী ও তাদের দোসর ছাড়া বাংলাদেশের মানুষ যেমন প্রায় চল্লিশ বছর ধরে ৭১'র যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য দিন-ক্ষণ গুণছেন আর অপেক্ষা করছেন, যদিও ইতোমধ্যে অনেকেই মারা গেছে এবং বাস্তবে ন্যায়বিচার করা অসম্ভব, আস্তিকরাও তেমনি সকল প্রকার অপরাধীদের চূড়ান্ত বিচারের জন্য শেষ বিচার দিবসের আশায় অপেক্ষা করছেন। অতএব, নৈতিক ও যৌক্তিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই আস্তিকদের বিশ্বাসের মধ্যে সামান্যতমও কোনো ভেজাল নেই। কিন্তু নাস্তিকরা অপরাধী ও তাদের ভিকটিমদের ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করে না। নাস্তিকদের বিশ্বাস অনুযায়ী খুনী, ধর্ষক, সন্ত্রাসী, ও বড় বড় গণহত্যাকারীরা মারা গেলে তাদের কোনো বিচার হবে না! তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী বুদ্ধ ও হিটলারের মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই। মাদার তেরেসা ও বিন লাদেনের মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই। পলপট ও গান্ধির মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই। টেররিষ্ট ও সেইন্ট এর মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই। ভাল ও মন্দের মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই। সত্য ও মিথ্যার মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই।
অতএব, অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে যে, নাস্তিকতা ও মানবতাবাদ একে-অপরের বিপরীত। কেউ একই সাথে নাস্তিক ও মানবতাবাদী হতে পারে না। একদিকে নাস্তিকতা প্রচার অন্যদিকে মুখে মানবতাবাদের বুলি কাঁঠালের আমসত্বের মতই শুনায়। প্রকৃত মানবতাবাদী হতে হলে ন্যায়-অন্যায়ের চূড়ান্ত বিচারে বিশ্বাস করতেই হবে। আর ন্যায়-অন্যায়ের চূড়ান্ত বিচারে বিশ্বাস করতে হলে মৃত্যুপরবর্তী জীবন ও স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাসী হতেই হবে। এর বিকল্প কোনো পথই যে খোলা নেই!
হিটলারের মতো গণহত্যাকারীদের কেনো বিচার হবে না – এই প্রশ্নের যৌক্তিক জবাব না দিয়ে (অপ)বিজ্ঞান আর (কু)যুক্তিবাদ এর ছদ্মাবরণে নাস্তিকতা প্রচার সম্পূর্ণরূপে অযৌক্তিক ও অমানবিক।
নাস্তিকরা (অপ)বিজ্ঞান আর (কু)যুক্তিবাদ এর আড়ালে সকল প্রকার ইভিলের জন্য ধর্ম ও স্রষ্টাকে দায়ি করে আমজনতাকে বোকা বানিয়ে একদিকে যেমন মানবতাবিরোধী ভয়ঙ্কর ডগমা প্রচার করছে অন্যদিকে আবার আবল-তাবল বই-পুস্তক লিখে নিজেদের পকেটও ভারি করছে। বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদ তাদের মুখের বুলি মাত্র। ভাবসাব দেখে মনে হবে যেনো “বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদ” তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি। বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের সাথে তাদের বিশ্বাসের সংঘাত থাকতে পারে, যেটা তারা আপডেট করতে নারাজ, কিন্তু তাদের নিজস্ব সমস্যাকে অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া শুধু অযৌক্তিকই নয় সেই সাথে অনৈতিকও বটে। সমস্যার প্রকৃত উৎসে না যেয়ে তারা অত্যন্ত সস্তাভাবে সকল প্রকার ইভিলের জন্য ধর্মকে দায়ী করে নিজেদের ফায়দা লোটার চেষ্টায় রত। নাস্তিক্য ও সেক্যুলার আইডিওলজির উপর ভিত্তি করে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষের হত্যাকান্ডকে তারা বেমালুম চেপে যেয়ে বারংবার শুধু ধর্মকেই দায়ী করে যাচ্ছে। অথচ যুগে যুগে ধর্ম এসেছে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার সমাধান নিয়ে, যদিও কালের পরিক্রমায় মূল ধর্মের সাথে কিছু কুসংস্কার ও ডগমা যোগ হয়ে ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে ব্যহত করেছে। মূল ধর্ম কোনো ভাবেই মানুষকে খাঁচায় তথা দাসত্বের বন্ধনে বন্দি করতে আসেনি – কোনো ভাবেই সাধারণ মানুষের উপর হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করতে আসেনি। বরঞ্চ মনুষ্য নির্মিত খাঁচা তথা মানুষ হয়ে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে এসেছে – নির্যাতক-নিপীড়কদের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষার জন্য এসেছে।
কিছু অনুসারীদের কর্মকাণ্ড দেখে ধর্মকে ‘ওপিয়াম’ মনে হলেও ধর্ম নিজে যে ‘ওপিয়াম’ নয় সে বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই। প্রকৃতপক্ষে, ধর্মই সকল প্রকার ওপিয়ামখোর ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে। আর এ কারণে ওপিয়ামখোর ও সন্ত্রাসীরাই ধর্মকে ভয় পায়। সৎ ও ভদ্র লোকজন কখনো ধর্মকে ভয় পায় না। কারণ ভয় পাওয়ার মতো তো কিছু নেই।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জানুয়ারি, ২০১৩ সকাল ১১:১৮