ইতিহাসের এক নন্দিত বিপ্লবী চরিত্রের নাম চে গুয়েভারা। ১৯২৮ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনায় জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। ৫ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়। পুরো নাম আর্নেস্তো গুয়েভারা দে লা সের্না। তবে তিনি সারা বিশ্বে পরিচিত চে গুয়েভারা নামে। একাধারে তিনি ছিলেন, মার্কসবাদী বিপ্লবী, চিকিৎসক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, গেরিলা নেতা, কূটনীতিবিদ ও সামরিক তত্ত্ববিদ। তিনি ছিলেন কিউবা বিপ্লবের প্রধান ব্যক্তিত্ব। মৃত্যুর ৫০ বছর পরেও টাইম পত্রিকার বিংশ শতাব্দীর সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী ১০০ জন ব্যক্তির তালিকায় রয়েছে চে গুয়েভারার নাম। আজ এই বিপ্লবী কিংবদন্তীর ৮৫তম জন্মদিন।
চে’র ছোটবেলা : খুব শৈশব থেকেই সমাজের বঞ্চিত, অসহায়, দরিদ্রদের প্রতি এক ধরনের মমত্ববোধ তাঁর ভিতর তৈরি হতে থাকে। সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারার পরিবারে বেড়ে ওঠার করনে খুব অল্প বয়সেই তিনি রাজনীতি সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান লাভ করেন। তার বাবা ছিলেন স্পেনের গৃহযুদ্ধে(Spanish Civil War) রিপাবলিকানদের একজন গোড়া সমর্থক, সেই সংঘর্ষের সৈনিকদের তিনি প্রায়ই বাড়িতে থাকতে দিতেন।
তার খেলধুলার পছন্দ তালিকায় ছিল সাঁতার, ফুটবল,গলফ, শুটিং। চে গুয়েভারা সাইক্লিংয়ের একজন অক্লান্ত খেলোয়ার ছিলেন। তিনি রাগবি ইউনিয়নের একজন অতি আগ্রহী সদস্য ছিলেন এবং বুয়েনস এয়ারস বিশ্ববিদ্যালয় রাগবি দলের হয়ে খেলেছেনও। রাগবি খেলার ক্ষিপ্রতার জন্য তাকে ফিউজার (fuser) নামে ডাকা হত। তার বিদ্যালয়ের সহপাঠীরা তাকে ডাকত চানচো (pig) বলে, কারণ তিনি অনিয়মিত স্নান করতেন এবং সপ্তাহে একবার মাত্র পোশাক পাল্টাতেন।
১২ বছর বয়সে দাবা খেলা শেখেন তার বাবার কাছে এবং স্থানীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করেন।
চে বয়সন্ধি থেকে শুরু করে সারাটা জীবন কবিতার প্রতি আসক্ত ছিলেন বিশেষ করে পাবলো নেরুদা, জন কিটস, এন্টনিও মারকাদো, ফেদেরিকো গারসিয়া লরকা, গ্যাব্রিয়ল মিনস্ট্রাল এবং ওয়াল্ট হুয়িটম্যান তার পছন্দের। তিনি ভালো কবিতা আবৃত্তি করতে পারতেন।
চে কোন ধর্মে বিশ্বাসী না হয়ে কালক্রমে নিজেকে একজন সমাজ সচেতন মানুষ হিসাবে গড়ে তোলেন। এসময় চে বুঝতে পারেন ধনী-গরিবের ব্যবধান ধ্বংস করে দেবার জন্য বিপ্লব ছাড়া আর কোন উপায় নেই। তখন থেকেই তিনি মার্কসবাদ নিয়ে পড়ালেখা শুরু করেন এবং সচক্ষে এর বাস্তব প্রয়োগ দেখার জন্য গুয়াতেমালা ভ্রমণ করেন।
এই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে তিনি রাষ্ট্রপতি জাকোবো আরবেনজ গুজমানের নেতৃত্বাধীন গুয়াতেমালার সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৪ সালে সিআইএ-এর ষড়যন্ত্রে গুজমানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে চে’র বৈপ্লবিক আদর্শ ও চেতনা আরো বদ্ধমূল হয়। পরবর্তীকালে মেক্সিকো সিটিতে বসবাসের সময় তাঁর সঙ্গে রাউল ও ফিদেল কাস্ত্রোর আলাপ হয়। চে তাদের সাথে আন্দোলনে যোগ দেন। মার্কিন-মদদপুষ্ট কিউবান একনায়ক ফুলজেনসিও বাতিস্তাকে উৎখাত করার জন্য সমুদ্রপথে কিউবায় প্রবেশ করেন। খুব অল্পদিনেই চে ফিদেলের বিপ্লবী সংঘের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
কিউবা বিপ্লব : বিপ্লবের পরিকল্পনায় কাস্ত্রের প্রথম পদক্ষেপ ছিল মেক্সিকো হতে কিউবায় আক্রমণ চালান। ১৯৫৬ সালের ২৫শে নভেম্বর তারা কিউবার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। পৌছানোর সাথে সাথেই বাতিস্তার সেনাবাহীনি কর্তৃক আক্রন্ত হন।তার ৮২ জন সহচরী মারা যান অথবা কারাবন্দী হয়, মাত্র ২২জন এ যাত্রায় বেঁচে যায়।গেভারা লিখেছিলেন সেটা ছিল সেই রক্তক্ষয়ী মুখামুখি সংঘর্ষের সময় যখন তিনি তার চিকিত্সা সামগ্রীর সাথে একজন কমরেডের ফেলে যাওয়া এক বাক্স গোলাবারুদ নিয়েছিলেন, যা তাকে পরিশেষে চিকিৎসক থেকে বিপ্লবীতে পরিনত করে।
সিয়েরা মস্ত্রা পর্বতমালায় বিদ্রোহীদের ছোট্ট একটা অংশ পুনরায় সংঘবদ্ধ হতে পেরেছিল। সেখানে তারা ২৬ শে জুলাই আন্দোলনের গেরিলা এবং স্থানীয় লোকজনদের সহযোগিতা লাভ করেছিলেন। সিয়েরা থেকে দল উঠেয়ে দেবার সময় কাস্ত্রোর একটি সাক্ষাতকার নিউয়র্ক টাইমসে প্রকাশ করা হয়। যার আগে ১৯৫৭ পর্যন্ত সারা পৃথিবীর মানুষ জানত না তিনি বেঁচে আছেন কি না! সেই নিবন্ধে কাস্ত্রো ও বিপ্লবীদের কাল্পনিক ছবি ছিল। গেভারা সেই সাক্ষাতকারে উপস্থিত ছিলেন না কিন্তু কিছু দিন পর তিনি তাদের এই বিপ্লবে প্রচার মাধ্যমের গুরুত্ব বুঝতে পারেন। আত্মবিশ্বাসের সাথে সাথে রসদ সরবরাহ কমে এসেছিল পাশাপাশি ছিল প্রচণ্ড মশার উত্পাত তাই গেভারা সেই সময়টাকে যুদ্ধের সবচেয়ে ব্যাথার সময় বলে অবহিত করেছিলেন।
যুদ্ধচলাকালীন চে বিদ্রোহী সেনাবাহিনীর অখন্ড অংশ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ফিদেল কাস্ত্রোকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, কূটনীতি এবং অধ্যবসায়ের কথা জানিয়ে ছিলেন। গেভারা গ্রেনেড তৈরির কারখানা, রুটি সেকানোর জন্য চুল্লি প্রস্তুত এবং নিরক্ষর সঙ্গীদের লেখাপড়ার জন্য পাঠশালা তৈরি করেন। তাছাড়াও তিনি একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, সামরিক প্রশিক্ষনের কর্মশালা আয়োজন এবং তথ্য সরবরাহের জন্য পত্রিকা প্রচার করতেন। বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন তিন বছর পর তাকে ‘কাস্ত্রোর মস্তিষ্ক’ বলে আখ্যায়িত করেছিল। তার পর তিনি বিদ্রোহী বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে পদোন্নতি পান। গেভারা শৃঙ্খলার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন, কর্তব্যে অবহেলাকারীদের তিনি নির্দ্বিধায় গুলি করতেন। তার এই প্রচন্ড মানসিকতা তাকে তার ইউনিটে সবার চেয়ে ভয়ংকর করে তুলেছিল। তাই গেরিলা অভিযানের সময় গুপ্তঘাতকদের মৃত্যুদন্ড দেবার দায়িত্ব ছিল তার উপর। চে এমন কঠিন প্রশাসক হওয়া সত্ত্বেও সৈন্যদের শিক্ষক হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং কাজের ফাকে তাদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থাও করতেন।
১৯৬৫ সালে চে কিউবা ত্যাগ করেন। তার ইচ্ছা ছিল কঙ্গো-কিনশাসা ও বলিভিয়াতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বলিভিয়াতে তিনি সিআইএ মদদপুষ্ট বলিভিয়ান বাহিনীর কাছে ধরা পড়েন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদদপুষ্ট বলিভিয়ার তত্কালীন সামরিক জান্তা বারিয়েন্তোসের স্বৈরাচারী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে চে সহযোদ্ধাদের নিয়ে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেছিলেন।
চে গুয়েভারার মুত্যু : বলিভিয়ার সেনাবাহিনীর ভাষ্যমতে তারা গুয়েভারাকে ৭ অক্টোবর গ্রেপ্তার করে এবং তার মৃত্যু হয় ৯ অক্টোবর ১৯৬৭ সাল বেলা ১.১০ টায়। মৃত্যুর এ সময়কাল এবং ধরণ নিয়ে মতভেদ এবং রহস্য এখনো আছে। ধারণা করা হয় ১৯৬৭ সালের এই দিনটিতে লা হিগুয়েরা নামক স্থানে নিরস্ত্র অবস্থায় নয়টি গুলি করে হত্যা করা হয় বন্দী চে গেভারা। পরে বলিভিয়ার সেনাবাহিনী ঘোষণা করে যে বন্দী অবস্থায় নয়টি গুলি চালিয়ে সেই আর্জেন্টাইন ‘সন্ত্রাসবাদী’কে মেরে ফেলতে পেরেছে এক মদ্যপ সৈনিক। তবে আরেকটি মতামত হচ্ছে এই দিন যুদ্ধে বন্দী হলেও তাকে এবং তার সহযোদ্ধাদের হত্যা করা হয়।
তবে বিপ্লবীর মৃত্যু নেই চে’র মৃত্যুর পর তিনি যে চেতনার জন্ম দিয়ে গেছেন তার মৃত্যু কোন দিন হবে না। চে গুয়েভারাকে উদ্দেশ্য করে উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটি কবিতা লিখেছেন।
[চে গুয়েভারার প্রতি
চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়
আমার ঠোঁট শুকনো হয়ে আসে, বুকের ভেতরটা ফাঁকা
আত্মায় অভিশ্রান্ত বৃষ্টিপতনের শব্দ
শৈশব থেকে বিষণ্ন দীর্ঘশ্বাস
চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরধী করে দেয়-
বোলিভিয়ার জঙ্গলে নীল প্যান্টালুন পরা
তোমার ছিন্নভিন্ন শরীর
তোমার খোলা বুকের মধ্যখান দিয়ে
নেমে গেছে
শুকনো রক্তের রেখা
চোখ দুটি চেয়ে আছে
সেই দৃষ্টি এক গোলার্ধ থেকে ছুটে আসে অন্য গোলার্ধে
চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়।
........................]
অসম্ভবের স্বপ্ন দেখা বাস্তববাদী বিপ্লবী 'চে' নিজেই লিখেছেন...
[চলো যাই
জমাট বাঁধা অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে
আমাদের ললাটে অসংখ্য বিদ্রোহের তারা জ্বলছে
শপথের বহ্নিতে না হয় আমরা মরবো
অথবা জিতবো
যখন প্রথম বুলেটের শব্দে দেশ জেগে ওঠে
কারুময় ঘুম থেকে আচমকা কোন এক বালিকার মতোন
তখনো অবিচলিত থেকো, হে যোদ্ধা
আমরা তোমার পাশেই আছি...
থাকবো।...]
মানবতার জয়গান গাওয়া, অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলা, শোষিতের পক্ষে লড়াই করে যাওয়া বিপ্লবী চে’র জন্মদিনে শুভেচ্ছা।
Click This Link
আলোচিত ব্লগ
কবিতাঃ সুবহানার বীরত্ব

সুবহানা খুব ছোট্ট হলেও, দারুণ মিষ্টি দেখতে,
চটপটে, বেজায় সাহসী , কেউ পারে না রুখতে।
স্কুল থেকে ফেরার পথে একদিন দুপুরবেলা
অনাথ দুটি শিশু বসে করছিল কি এক খেলা।... ...বাকিটুকু পড়ুন
গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...
গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...
একসময় ভারতীয় কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ কিংবা বাংলাদেশের কিছু ক্ষমতাসীন নেতা এমন ভাষায় কথা বলতেন, যেন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নয়; বরং কোনো ছোট ভাই, আদরের বোন বা... ...বাকিটুকু পড়ুন
অন্তর্দিগন্ত

যে নদী সাগরকে ছোঁয়নি, সে-ই গায় সবচেয়ে নির্মল সঙ্গীত।
যে বৃক্ষের শাখা ফলের ভারে নত হয়নি, সে-ই আকাশকে বেশি বোঝে, বাতাসকে বেশি শোনে।
পৃথিবীর প্রাচীনতম ভ্রমগুলোর একটি এই,
মানুষ ভেবেছে প্রাপ্তিই পরিত্রাণ।
তাই... ...বাকিটুকু পড়ুন
Laptop Stand কেন দরকার?
Laptop Stand কেন দরকার? | Digital Fast IT থেকে স্মার্ট সমাধান

দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ ব্যবহার করলে অনেকেরই একটি সাধারণ সমস্যা দেখা দেয়—ল্যাপটপের নিচের অংশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। অতিরিক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইমিগ্রেশনেই ধরা খেল বিএনপির কূটনীতি

ধরুন আপনার পাশের বাড়ির সাথে সম্পর্ক ভালো না। দীর্ঘদিনের পুরনো ঝামেলা, কথা বলাবলি বন্ধ, একে অপরকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। এই অবস্থায় পাশের বাড়িতে একটা বৈঠক... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।