কায়রো আসার দুই সপ্তাহ পরের কথা । হঠাৎ একদিন মনে হল, আরে নীলনদ তো এখনো দেখা হয়নি ! অথচ বাসা থেকে মাত্র ২-৩ কিলোমিটার দূর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চলেছে আমার অন্যতম প্রিয় নদ ।দেখার আগেই যার প্রেমে আমি পড়েছি।
আসলে কায়রো আসার পর ভিসা নেয়া, ভার্সিটিতে এডমিশন নেয়া ও অন্যান্য ব্যস্ততার ভিড়ে সময় হয়ে উঠেনি ।
নীলনদকে ঘিরে রয়েছে কতশত রূপকথা,গল্প-কবিতা-উপন্যাস, হাসি-কান্না আর ৭ হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন। মনে পরতেই কেমন যেন রোমাঞ্চে ভরে উঠে মন ।
তো বিকালে বেড়িয়ে পড়ি নীল দর্শনে ।আমার সঙ্গী বললেন: চলেন তাহরীর স্কয়ার হয়ে যাই । ভাবলাম,মন্দ কী ? এক সঙ্গে দুটোই দেখা হবে ।
এক পাউন্ডের মেট্রো রেলে চড়ে বসলাম (এক পাউন্ডের মানে হল,কায়রোর যেখানেই যান-কাছে কিংবা দূরে-টিকিট মূল্য একই)।
নামলাম আনওয়ার সাদাত স্টেশনে ।এটা গ্রাউন্ডে , শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ।উপরে উঠতেই ঐতিহাসিক তাহরীর স্কয়ার, বাংলায় অর্থ করলে হয় 'স্বাধীনতা চত্তর' ।
তখন সবে মাত্র তীব্র আন্দোলনের মুখে ত্রিশ বৎসরের একনায়কতন্ত্রের পতনের পর মিশরের ইতিহাসের প্রথম গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে।
দেয়ালে দেয়ালে অংকিত লেখা যেন দূর্বার গণআন্দোলনের সাক্ষ্য দিচ্ছে ।
আরেকদিন নাহয় তাহরীর নিয়ে লেখব ।
আরব লীগ ইউনিভার্সিটি হাতের ডানে রেখে কিছুদূর এগোতেই দেখা মিলল কাংক্ষিত ভালবাসার । যদিও শহুরে মোড়কে তার দোর্দন্ড প্রতাপ কিছুটা ম্রিয়মান ।
তীরে দাঁড়াতেই মন-প্রাণ জুড়ানো বাতাস এসে প্রাণ জুড়িয়ে দিল ।
কায়রোর রাতের নীল অপরূপ সাজে সজ্জিত হয় । বাহারী রংয়ের আলোয় আলোকিত নৌকায় বসে বিখ্যাত ব্যালে ড্যান্সের আসর ।চলে ভোর অবধি ।
এবার নীলের ভৌগলিক অবস্থান আলোচনা করা যাক :
বিশ্বের দীর্ঘতম নদের নাম নীল নদ। যার দৈর্ঘ্য ৬ হাজার ৬৫০ কিলোমিটার। নীল নদের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে প্রাচীন মিসরের সভ্যতা। প্রতি বছর নীল নদের বন্যায় পলি পড়ে অতিমাত্রায় উর্বর হয়ে ওঠা উভয় তীরে প্রচুর ফসল হতো। এ ছাড়া খালের সাহায্যে পানি নিয়ে নীল নদের দুই তীরের দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতেও চাষাবাদ করা হতো।আফ্রিকা মহাদেশের এই নীল নদ বিশ্বের দীর্ঘতম নদীরও স্বীকৃতি পেয়েছে। এর দুটি উপ-নদ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে শ্বেত নীল নদ ও নীলাভ নীল নদ। এর মধ্যে শ্বেত নীল নদ দীর্ঘতর। শ্বেত নীল নদ আফ্রিকার মধ্যভাগের হ্রদ অঞ্চল হতে উৎপন্ন হয়েছে। এর সর্বদক্ষিণের উৎস হলো দক্ষিণ রুয়ান্ডাতে। এটি এখান থেকে উত্তরদিকে তাঞ্জানিয়া, লেক ভিক্টোরিয়া, উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নীলাভ নীল (ব্লু নাইল) নদ ইথিওপিয়ার তানা হ্রদ হতে উৎপন্ন হয়ে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে সুদানে প্রবেশ করেছে। দুটি উপনদই পরে সুদানের রাজধানী খার্তুমের কাছে মিলিত হয়েছে। নীল নদের উত্তরাংশ সুদানে শুরু হয়ে মিসরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। মিসরীয় সভ্যতা প্রাচীনকাল থেকেই নীলের ওপর নির্ভরশীল। মিসরের জনসংখ্যার অধিকাংশ এবং বেশির ভাগ শহরের অবস্থান নীল নদের উপত্যকায়। প্রাচীন মিসরের অনেক সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার অবস্থানও এখানে। কঙ্গো, তাঞ্জানিয়া, কেনিয়া, উগান্ডা, ইথিওপিয়া, মিসর জুড়ে বিস্তৃত নীল নদ ভূমধ্যসাগরে গিয়ে মিশেছে। পৃথিবীর সব নদ-নদী উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হলেও নীল নদ দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়।
মহাকালের সাক্ষী আমার প্রিয় নীলের জলধারায় সবাইকে আমন্ত্রন ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


