বাবাই এখন ক্লাস ওয়ানে পড়ে। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পাশাপাশি বাবাইয়ের মধ্যে যা পরিবর্তন এসেছে – তা হল সে এখন আর “ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া” নেই। তাকে “ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া” বলে ডাকলে সে জবাব দেয় না। গম্ভীর মুখে নিজের কাজ করতে থাকে। নোভেরা এবং জাহিদ প্রথম কিছুদিন খুব নিশ্চিন্তে কাটালো- যাক “ক্যাপ্টেন বাবাকোয়ার গোপন মিশন সমূহ” সম্ভবত শেষ হয়েছে। ইদানীং সেই ডায়েরিটাও দেখা যাচ্ছে না। রেখে দিয়েছে মনে হয় নিজের বাক্সে। এখন সে বাবাই নামেই চলছে। “ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া” ডাকলে সাড়া শব্দ করে না। লক্ষ্মী ছেলের মত সে এখন নিয়মিত স্কুলে যায়, টিফিন খায়, হোম ওয়ার্ক করে, সন্ধ্যা হলেই পড়ার টেবিলে অংক বই, ইংরেজী বই নিয়ে পড়তে বসে যায়। এমন কি লেফটেনেন্ট মুরগীর লাল নীল রযাং কের ব্যাজও খুলে নিয়েছে বাবাই। সে এখন সিভিলিয়ান মুরগী হয়ে ঘুরে বেড়ায়। বাবলিকেও ঘাটাতে যায় না একদম। বাবলির বয়স নয় মাসের মত হতে চলল। সে এখনো হামাগুড়ি দিতেই পছন্দ করে। যদিও দেয়াল ধরে বেশ ভাল ভাবেই হাটতে পারে। তার প্রধান কাজ হল আলু সেদ্ধ খাওয়া। ছোট বাটিতে বাবলিকে আলু সেদ্ধ করে লবণ মেখে দিলে সে মহানন্দে আলু খেতে থাকে। আলু খাওয়ার জন্য জাহিদ বাবলির নাম রেখেছে “আলুবতী”। এই নামে নোভেরার আপত্তি আছে। কিন্তু জাহিদের কথা হলঃ “ রাজকন্যাদের নাম যদি কলাবতী, ভানুমতী, চন্দ্রাবতী, পার্বতী- হতে পারে- আমার মেয়ের নাম আলুবতী হতে দোষ কি?” নোভেরা কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে। তাদের আলুবতীকে সারা ঘরময় আলুর বাটি নিয়ে হামাগুড়ি দিতে দেখা যায় এখন। বাবাই আগে বাবলির আলু সেদ্ধ খেয়ে ফেলত- এবং বাবলি শরীর বাঁকিয়ে গলা ফাটিয়ে চেঁচাতো। ইদানীং বাবাই আলু খেতে যায় না। বাবলি এখন মহাসুখে আলু খায়। বিরক্ত করে না তাকে বাবাই।
বাবাই এখন “আদর্শ শিশু”। তার ক্লাস টিচার মনতাজ উদ্দিন জাহিদ আর নোভেরাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে পান চিবাতে চিবাতে বলেছেন, “ভেরি ইন্টেলিজেন্ট বাচ্চা! নিয়মিত বাড়ীর কাজ করে আনে, মারামারিও করে না, ক্লাসে পড়া ধরলে সব গড়গড়িয়ে বলে দায়! দেখবেন নির্ঘাত এই পোলা ফার্স্ট হবে। আপনারা কেয়ার নিবেন ওর। অতি শান্ত শিষ্ট বাচ্চা, ভেরি সিম্পুল বয়!”
জাহিদ আর নোভেরা শূণ্য দৃষ্টিতে একে অন্যের মুখ চাওয়া চাওয়ি করেছে কেবল। “অতি শান্ত শিষ্ট বাচ্চা?” জাহিদ প্রতিধ্বনি করল মনতাজ উদ্দিনের কথাটার।
পানের পিক ফেলতে ফেলতে মনতাজ সাহেব উদার মুখে হেসেছেন, “ ইয়েস! ভেরি শান্ত শিষ্ট বাচ্চা। সিম্পুল বয়!”
নোভেরা ঢোক গিলেছে শুধু। বাবাইয়ের এই আমূল পরিবর্তনের ব্যাপারটা হজম করতে কষ্ট হচ্ছে তার। যে ছেলে এতদিন ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দিয়ে তাকে সারাক্ষণ অস্থির করে রাখতো- সে কিনা হয়ে গেছে “ভেরি সিম্পুল বয়! আদর্শ বাচ্চা!”
বাবাইয়ের এই হঠাৎ ভাল হয়ে যাওয়াটা নিয়ে প্রথম কিছুদিন নিশ্চিন্তে কাটালেও ধীরে ধীরে দুশ্চিন্তা হতে থাকে নোভেরার। ছোট মানুষ তো দুষ্টামী করবেই। এত ভাল হয়ে গেল কেন? হাসপাতালে গিয়েও নোভেরা শান্তি পায় না। ছেলেটা এরকম বদলে গেছে কেন? বাসায় ফিরে এখন সব সময় বাসা গোছানো, পরিপাটী অবস্থায় পায় সে। কোনো জিনিস নড়েওনি সামান্য। নোভেরার দুশ্চিন্তার চারাগাছের ডালপালা আর শেকড় দ্রুত বাড়তে থাকে। বট বৃক্ষের আকার নিয়ে নিল অল্প কদিনেই।
এর পর দেখা গেল নোভেরা দু সপ্তাহের মাথায় একদিন শাড়ী টাড়ী পরে বাবাইকে নিয়ে হাজির হয়েছে বিখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ প্রোফেসর ডা. জাফর উল্লাহ সাহেবের চেম্বারে। লম্বা সিরিয়াল ছিল। নোভেরা কীভাবে কীভাবে যেন সবাইকে পাশ কাটিয়ে চেম্বারে ঢুকে গেল বাবাইকে নিয়ে।
বাবাই বিষয়ক সমস্যা জানালো তাকে নোভেরা উদ্বিগ্ন মুখে, “ স্যার আমার ছেলেটা আগে অনেক দুষ্টু ছিল। হঠাৎ করে কেন জানি খুব ভাল হয়ে গেছে! নিয়মিত পড়াশোনা করে টিফিন খায়, হোমওয়ার্ক করে- আমার কিছুই বলতে হয় না। এরকম কেন?”
প্রোফেসর জাফর উল্লাহ সাহেব মাথার উইগটা বারবার ঠিক করতে করতে নোভেরার দিকে তাকিয়ে বিগলিত হাসি দিলেন, “সবাই আমার কাছে আসে বাচ্চার দুষ্টামী কমানোর জন্য- তুমি এসেছে দুষ্টামী কেন করে না জানার জন্য! হা হা হা!!” বিশাল কোনো রসিকতা করে ফেলেছেন- এমন ভঙ্গিতে হাসতে লাগলেন।
ভূঁড়ি কাপানো হাসিটা সামান্য কমার পর তিনি বাবাইয়ের দিকে তাকালেন। বড় বড় চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে সহজ গলায় বললেন, “এখন বলতো ইয়াং ম্যান- তোমার সমস্যাটা কি?”
বাবাই গম্ভীর মুখে উত্তর দিল, “সমস্যা নাই।”
“দুষ্টামী নাকি ছেড়ে দিয়েছো? কেন? প্রেমে ট্রেমে পড়েছো নাকি?” চোখ নাচালেন হাসি হাসি মুখে।
বাবাই চিন্তিত গলায় বলল, “মনে হয় না।”
“কোনো মেয়েকে পছন্দ হয়?” আগ্রহি মুখে সামনের দিকে ঝুকে এলেন।
আবার চিন্তা করল বাবাই। তার ক্লাসে তেমন কোনো মেয়ে নেই যে পছন্দ করা যায়। বিন্তিকে পছন্দ করে অল্প স্বল্প- কিন্তু একটুতেই মারামারি, খামচা খামচি শুরু করে দেয় বলে ওকে ভয় পায় বাবাই। ভারী গলায় বলল, “নাহ। একটাও পছন্দ হয় না।”
“কি বলো? পছন্দ হয় না? আমি তো তোমার বয়সে ছ্যাঁকা খেয়ে নিয়মিত কোকাকোলা আর কেরসিন খেতাম!”
বাবাই উৎসাহী মুখে বলল, “কেরসিন আমিও খাই। গন্ধটা ভাল লাগে খুব। স্বাদটাও ভাল তাই না?”
নোভেরা আতংকিত চোখে ছেলের দিকে তাকাল। এই ছেলে কেরসিন খায়? কখন খেয়েছে? একবারও তো বুঝতে পারেনি!
আরো ঝুঁকে এলেন, কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বললেন ডাক্তার সাহেব, “বিয়ে শাদী করতে ইচ্ছা করে?”
বাবাই খানিক্ষণ চিন্তা করল। আজকাল মেয়েরা ফ্রক পরে স্কুলে যায়। বোরখা পরে না কেউ। এক সাথেই ক্লাস করতে হয়। পর্দা হয় না। বেহেসতে যাওয়া যাবে না এরকম হলে। বিয়ে করে ফেলাই ভাল। মাথা ঝাঁকালো, “হু। বিয়ে করে ফেলা উচিত।”
নোভেরা হতভম্ব হয়ে গেল ছেলের কথা শুনে।
জাফর সাহেব সব আবিষ্কার করে ফেলার ভঙ্গিতে বললেন, “নোভেরা, তোমার ছেলেকে বিয়ে দিয়ে সেন্ট মার্টিনে পাঠায় দেও হানিমুনে। সমস্যা শেষ!”
নোভেরা মাছের মত খাবি খেতে খেতে বলল, “ব্-বিয়ে!”
“অবশ্যই!” টেবিলে থাবা দিয়ে বললেন জাফর সাহেব, “ ছোট খাট একটা বৌ ধরে নিয়াসো ছেলের জন্য। বিয়ের জন্য কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করার দায়িত্ব আমার। জানা শোনা আছে প্রচুর। ফোন দিলেই সব ব্যবস্থা করে দেবে।”
“ক্-কমিউনিটি সেন্টার?”
“হ্যাঁ। ভাল টেইলরের সাথেও পরিচয় আছে। বাবাইয়ের জন্য শেরওয়ানী বানায় দিবে। মানুষ ছোট বলে কি শেরওয়ানী-পাগড়ি পরবে না? অবশ্যই পরবে।” আবারও টেবিলে থাবা মারলেন।
বাবাইও বিজ্ঞ ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালো। সেও একমত। শেরওয়ানী পাগড়ি লাগবে তার। বিয়ে বলে কথা।
“স্যার আপনি সিরিয়াস?”
“একশো বার!” মাথার উইগটা উত্তেজনায় একপাশে সরে গেল তার। টেবিলে থাবা মারাটা মনে হয় তার পছন্দের একটা কাজ।
নোভেরা শুঁকনো মুখে বাবাইকে নিয়ে উঠে চলে এসেছে।
ওরা বাসায় যখন ফিরলো- জাহিদ ড্রয়িং রুমে টিভি চালিয়ে প্যাপার পড়ছিল। নোভেরাদের দেখে প্যাপার থেকে মুখ তুলল, “কি খবর রোগীর? ডাক্তার কি সমাধান দিলো?”
নোভেরা যন্ত্রের মত কেবল বলল, “তোমার ছেলের বিয়ে দিতে বলেছে।”
“বাহ! তাই নাকি?” বাবাইয়ের দিকে তাকালো জাহিদ, “মেয়ে পছন্দ আছে? নাকি ঘটক পাখি লাগাতে হবে তোর বায়োডাটা দিয়ে?”
বাবাই জবাব না দিয়ে গম্ভীর মুখে বাবলির দিকে তাকালো। জাহিদের পাশে সোফায় চিত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। ঘুমিয়ে থাকার ভঙ্গিটা বাবাইয়ের ঠিক উল্টো। হাত-পা ভাঁজ করে আকাশের দিকে তুলে রেখেছে। ডান হাতে মুঠো করে ধরে রেখেছে একটা সেদ্ধ আলু। ভর্তা বানিয়ে ফেলেছে ওটা। গভীর ঘুমে। ছোট পেটটা ধীরে ধীরে ওঠা নামা করছে নিঃশ্বাসের সাথে।
নোভেরা জাহিদের কথার জবাবে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল- বাবাই ভারী গলায় বলল, “কথা বলিও না। বাবলি ঘুমায়। কথা বললে ঘুম ভাঙে যাবে ওর।” নিজের ঘরে চলে গেল বাবাই। নোভেরা আর জাহিদ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ছেলের দিকে। দীর্ঘ একটা মুহূর্ত নীরবতা।
তারপরেই নোভেরা কাঁদো কাঁদো মুখে জাহিদকে বলল, “এই তুমি একটা হুজুর ডাকো তো। আমার বাবাই সোনাটার ওপর নিশ্চই জ্বীনের আছর লেগেছে। আমার ভাল লাগছে না একটুও.... এরকম বড় মানুষের মত হয়ে গেছে কেন ও?”
জাহিদ ব্যস্ত গলায় বলল, “আহ, তুমি এত চিন্তা করছো কেন? বাচ্চাদের কত রকমের খেয়াল থাকে! হয়ত এটাও খেয়াল।”
ফোঁপাতে লাগলো নোভেরা, “তারমানে ডাকবে না?”
“ডাকবো..... প্লিজ তুমি কান্না থামাও তো! একটুতেই কান্না কাটি করো!” কথা খুঁজে পেল না জাহিদ।
“এটা তোমার কাছে একটু মনে হল? এটা সামান্য ব্যাপার?” নোভেরা দৌড়ে বাথরুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। জাহিদ প্যাপার হাতে বোকার মত বসে রইল। বাথরুমের সঙ্গে মেয়েদের কান্না প্রীতির একটা সম্পর্ক আছে। বেসিনের ট্যাপ ছেড়ে ছেড়ে কাঁদে। নোভেরাও ব্যতিক্রম না। আধ ঘন্টা লাগবে ওর বের হতে।
পরের দিন সন্ধ্যাতেই জাহিদ নোভেরার কথা মত বড় মসজিদের খাদেম সাহেবকে নিয়ে এলো। এলাকায় জ্বীন তাড়ানি হুজুর নামে পরিচিতি আছে তাঁর। ঘরে পা দিয়েই বাজখাঁই গলায় বলে উঠলেন, “খামোশ! তুই এই বাড়ীতে আসে ঢুকছোস কোন সাহোসে? অ্যাঁ? ঠ্যাঙ্গায় তোরে বাইর করমু!”
জাহিদ ভীত গলায় বলল, “হুজুর? কার সাথে কথা বলেন?”
“কোহকাফের এক খবিশ জ্বীন এই বাসায় আস্তানা গাড়ছে!” দাঁড়িতে আঙ্গুল বুলাতে বুলাতে বললেন। কথা বলার সময় পানের কষ গড়িয়ে দাঁড়িতে এসে নামে তাঁর।
নোভেরা মাথায় কাপড় দিতে দিতে শংকিত গলায় বলল, “কি বলেন হুজুর! সত্যি?”
“আলবৎ!” হুংকার দেয়ার ভঙ্গিতে বললেন, “বড়ই খবিশ জ্বীন। তবে আম্মা তুমি টেনশন করবা না। আমি যখন আসে গেছি- এই জ্বীনের নিস্তার নাই। ঝাঁটা পিটা করে বিদাই করমু ইনশাল্লাহ!”
জাহিদ ঢোক গিলে বলল, “হুজুর, সমস্যা তো আমার ছেলের। মানে বাবাইয়ের.....”
হাত তুলে থামিয়ে দিলেন, “জানি! জ্বীন তো ঐ ছেলের শরীলে ঢুকছে। ছেলেরে নিয়াসো। জ্বীনরে এমন দৌড়ানি দিমু যে কোহকাফ নগরে গিয়া দৌড় শেষ হইবো!”
খবিশ জ্বীন ভর করায় বাবাই এত ভদ্র হয়ে গেল কীভাবে সেটা বুঝতে পারলো না জাহিদ আর নোভেরা। মুখ চাওয়া চাওয়ি করল একে অন্যের।
“কই? ছেলেরে নিয়াসো?” আবার বললেন খাদেম সাহেব।
জাহিদ বাবাইকে নিয়াসতে গেল। হুজুর সাহেব তাঁর কাঁধের ঝোলাটা একপাশে রেখে ঘরের মেঝেতে একটা জায়নামায বিছিয়ে বসতে বসতে সোফার ওপর আলুর বাটি হাতে বসে থাকা বাবলির দিকে তাকালেন, “সোবহানাল্লাহ্! এইটা তোমাগো কন্যা?” নোভেরার দিকে তাকালেন।
“জ্বী হুজুর।” পুতুলের মত মাথা ঝাঁকালো নোভেরা। বাবলি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে হুজুরের দিকে। একটা আলু অর্ধেক মুখে দিয়ে রেখেছে। খেয়ে ফেলবে নাকি আবার বাটিতে রেখে দেবে বুঝতে পারছে না।
“জ্বীন তাড়ানোর সময় ঘরে তো কোনো কন্যা থাকতে পারবে না মা। মেয়েদের উপর জ্বীন সহজেই ভর করতে পারে। তুমি তোমার কন্যারে নিয়া পাশের বাসায় যাও। সব শেষ হলে আসবা।”
নোভেরা ভয়ে ভয়ে তাকালো একবার হুজুরের দিকে। তারপর কথা মত বাবলিকে নিয়ে বিন্তিদের বাসায় চলে গেল। বিন্তির ছোট মামা এসে দরজা দিয়ে উঁকি ঝুঁকি মারতে লাগল কেবল।
হুজুর সাহেব তাঁর পোটলা খুলে একটা পিতলের বাটি বের করে সেখানে শুঁকনো মরিচ রাখলেন কত গুলো। সরিষার তেল বের করে সেগুলো ভিজিয়ে মোম জ্বালালেন। মরিচগুলো বাটি সহ জ্বাল দিতে লাগলেন রুমালে ধরে। ভয়াবহ ঝাঁঝে ঘরে টেকা দায়।
তার মাঝেই জাহিদ বাবাইকে নিয়ে এলো হুজুরের সামনে। নোভেরাদের না দেখে অবাক হল জাহিদ, “হুজুর ওরা কোথায়.....”
হাত তুলে ভরাট গলায় বললেন, “জ্বীন ছাড়ানর সময় মেয়ে মানুষ থাকতে নাই। পাঠায় দিছি পাশের বাসায়।.... এইটাই তোমার ছেলে?”
“জ্বী।” শুঁকনো গলায় বলল জাহিদ।
বাবাইয়ের দিকে রক্তবর্ণ চোখে তাকালেন হুজুর, “খবিশ জ্বীন! আমার চোখ ফাঁকি দেওয়া অত সোজা না! তুই এই মাছুম পোলাটার গায়ে ভর করছোস! জানস আমাগো নবীজী বাচ্চাগো কত মোহাব্বত করতেন তোরে আইজ এমন দৌড়ানি দিমু যে কোহকাফ নগরে গিয়া দৌড় থামাইবি!” জাহিদ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাব হাতে বাবাইয়ের ঘাড় ধরে তাঁর সামনে বসালেন। বাবাই একটুও উচ্চ বাচ্চা করলো না। শান্ত মুখে বসে পড়ল। মরিচের ঝাঁঝে চোখ না জ্বলছে শুধু।
হুজুর সাহেব বাটিটা এনে বাবাইয়ের নাকের কাছে ধরে বোধ হয় বলতে গেলেন- “যা, দৌড়ায় কোহকাফ নগরে চইলা যা!”
কিন্তু ঘটল সম্পূর্ণ অন্য ঘটনা।
বাবাই মরিচের ঝাঁঝে শরীর কাঁপিয়ে হাঁচি দিয়ে পেছন দিকে পড়ে গেল। সাথে সাথে বাবাইয়ের বুক পকেট থেকে বিশাল একটা মেটে-সবুজ রঙের গেছো ব্যাঙ লাফ দিয়ে বেরিয়ে এলো। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ব্যাঙটা গিয়ে পড়ল সোজা হুজুর সাহেবের বিশাল ভূঁড়ির ওপর!
তারপরেই গগণ বিদারী চিৎকার দিয়ে হুজুর সাহেব লাফিয়ে উঠতে গেলেন। হাতের তেল-মরিচের বাটি ছিটকে পড়ল নিজের কোলের ওপর। গরম তেল মরিচ পড়া মাত্রই গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিলেন, “ওরে বাবাগে! আই গেছি!”
লুঙ্গির আঁট আগেই ঢিলা হয়ে ছিল। লাফিয়ে উঠতে গিয়ে পায়ে পেঁচিয়ে লুঙ্গি খুলে গেল তাঁর। ঝোলা পাঞ্জাবীর কারণে সম্ভ্রম রক্ষা পেল অল্পের জন্য। গরম তেল পড়ে উরু, পা জ্বলে যাচ্ছে তাঁর। তিনি ব্যাঙ্গের মত লাফাচ্ছেন। সবুজ গেছো ব্যাঙ যে কামড় দেয় এটা প্রথম জানতে পারলেন যখন দেখলেন ব্যাঙটা আবার লাফ মেরে তাঁর ঠিক পশ্চাত দেশে এসে কামড় মেরে ঝুলে রইল!
খনিকের জন্য চোখ গোল গোল করে বাবাই আর জাহিদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। পরক্ষনেই ভয়ংকর আতংকে উর্ধ্বশ্বাসে দৌড় লাগালেন হুজুর সাহেব। লুঙ্গি রেখেই দরজা ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেলেন। দেখা যাচ্ছে না তাঁকে। তবে সিঁড়িতে তাঁর বিশাল দেহের ভারী শব্দে আছাড় খাওয়ার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে! সেই সাথে তাঁর নানাবিধ চিৎকার!
বাবাই নাক ডলতে ডলতে উঠে বসল। চোখ জ্বলছে। জাহিদ হতভম্ব মুখে বাবাইয়ের দিকে তাকালো, “এটা কি হল বাবাই?”
বাবাই হাঁচি দিল, “কমান্ডো চিফ ক্যাপ্টেন গেছো ব্যাঙ। আজকে সকালেই স্কুলের ড্রেন থেকে তুলে এনে গোসল দিয়ে মিলিটারীতে ভর্তি করেছি। অনেক ভাল কমান্ডো- ঠিক না বাবা?”
জাহিদ ছেলের দিকে তাকালো হতচকিত মুখে, “তোর র্যাং কটা কি এখন?”
“কর্ণেল বাবাকোয়া। প্রোমোশনের পর নতুন ডায়েরী খুলেছি। খালামণি এলে দেখাতে হবে।” মুখভর্তি হাসি নিয়ে বলল বাবাই। হাঁচি দিচ্ছে এখনো।
পাশের বাসা থেকে হুজুর সাহেবের ধাড়ি গলায় চিৎকার শুনতে পেয়ে নোভেরা ছুটে এসেছিল। বাবলি মাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে- ভয় পেয়েছে। মুখে একটা আলু কামড়ে ধরে আছে।
“হুজুর কই?” নোভেরা ভীত গলায় বলল। জায়নামায আর মেঝেতে তেল-মরিচ পড়ে মাখামাখি অবস্থা। হুজুরের লুঙ্গি আর পুটলি পড়ে আছে। কেবল হুজুর সাহেব নাই।
জাহিদ থমথমে মুখে বলল, “কমান্ডো চিফ গেছো ব্যাঙের দৌড়ানি খেয়ে কোহকাফ নগরে চলে গেছেন মনে হয়!”
মিথিলার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে। নোভেরার বাসাতে ঢুকেই আবিষ্কার করল বাবাই যথারীতি খাওয়ার টেবিলের নিচে বসে গম্ভীর মুখে ডায়েরী লিখছে। মাথায় নীল হেলমেট। পাশে লেফটেনেন্ট মুরগী ঝিমাচ্ছেন। বয়স হয়েছে তার। সারাক্ষণ ঝিমায় কেবল। র্যাংমক বেড়েছে দেখা যাচ্ছে। লাল-নীল ফিতার সঙ্গে হলুদ একটা ফিতা লেগেছে লেফটেনেন্ট সাহেবের গলায়। তবে গায়ের বেশ কিছু পালক গায়েব হয়ে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে আগুণ লেগেছিল!
বাবাইয়ের সামনেই আলুবতী আলুর বাটি হাতে নিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছে। আলুগুলো নেড়ে চেড়ে দেখছে আনন্দিত মুখে। সে সব সময়ই আনন্দে থাকে। কখনই চিন্তিত অবস্থায় দেখা যায় না। জাহিদ ওর নামটা “আলুবতী আনন্দময়ী” রাখার চিন্তা ভাবনা করছে।
মিথিলা ওর ব্যাগ রেখে হাটু পেড়ে টেবিলের নিচে এসে ঢুকলো। উৎসাহী মুখে বাবাইকে জিজ্ঞেস করল, “আমার বাবাই সোনাটা কি করে?”
“উঁহু! কর্ণেল বাবাকোয়া!!” ডায়েরী থেকে চোখ না তুলেই খালামণিকে শুধরে দিল বাবাই।
বাবলিকে কোলে টেনে নিতে নিতে অবাক গলায় বলল, “কর্ণেল? একেবারে ট্রিপল প্রোমোশন? প্রোমোশনের মিষ্টি কই? মানি না মানি না!!”
বাবাকোয়ার পাশে রাখা টিফিন বক্সটা খানিক পর পর নড়ে চড়ে উঠছে। মিথিলা কৌতুহলী চোখে তাকালো সেটার দিকে।
বাবাকোয়া একটা নিঃশ্বাস ফেলে ডায়েরী বন্ধ করল, “হুট করেই প্রোমোশন নিয়েছি খালামণি। মাস খানেকের ছুটিতে ছিলাম। কেউ ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া বলে ডাকলে জবাব দিতাম না। ছুটি শেষে জয়েন করেছি। এখন আমি কর্ণেল বাবাকোয়া। এই দেখো? কর্ণেল বাবাকোয়ার গোপন মিশন সমূহ- নতুন ডায়েরী।” উজ্জ্বল মুখে ডায়েরীটা এগিয়ে দিলো।
মিথিলা অবাক হয়ে দেখল নতুন ডায়েরীতে বড় বড় করে বাবাই লিখেছেঃ “কর্ণেল বাবাকোয়ার গোপন মিশন সমূহ”। ডায়েরীর পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে মিথিলার বরাবরের মতই আক্কেল গুড়ুম অবস্থা।
“ পদোন্নতি ও নিয়োগ সমূহঃ
১. লেফটেনেন্ট মুরগীকে সেনাবাহিনীতে তাঁর সুচিন্তিত নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তাঁকে মেজর পদে উন্নত করা হয়েছে। যদিও ইদানীং সব সময় তাঁকে ঝিমাতে দেখা যায়। তাঁকে অতিশীঘ্রই আম্মুর হাসপাতালে ভর্তি করা হবে চিকিৎসার জন্য। একজন দেশ প্রেমিক সামরিক মুরগীর এটা নৈতিক অধিকার।
২. ক্যাপ্টেন বাবাকোয়াকে তাঁর সেনাবাহিনীতে সুদক্ষ নেতৃত্ব দানের জন্য কর্ণেল পদে উন্নত করা হয়েছে। আমি এখন কর্ণেল বাবাকোয়া।
৩. কমান্ডো চিফ ক্যাপ্টেন গেছো ব্যাঙকে বাবাকোয়া মিলিটারীতে নিয়োগ দিয়েছে। দক্ষ সাঁতারু, নৌ ও বিমান বাহিনী থেকে স্পেশাল কমান্ডো ট্রেনিং প্রাপ্ত তিনি। আমাদের স্কুলের পিছনের ড্রেন থেকে ফ্লাক্সে ভরে নিয়েসেছে বাবাকোয়া। আম্মার ভয়ে কমান্ডো গেছো ব্যাঙকে টিফিনে ভরে রাখতে হয়। আম্মা ওকে দেখলেই ভয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে ঘর মাথায় করে ফেলে। ক্যাপ্টেন গেছো ব্যাঙ্গের মন খারাপ তাই। তাঁর মত নিবেদিত প্রাণ কমান্ডোকে ভয় পাওয়া কি ঠিক? মোটেই ঠিক না। আম্মা শুধু শুধু বাবাকোয়ার কান ধরে ধমক মেরে বলে, “ঐটাকে আজকেই বাহিরে ছেড়ে দিয়াসবি! খবরদার যেন ওটাকে ঘরে না দেখি!”
কর্ণেল বাবাকোয়ার মন খারাপ গেছো ব্যাঙ্গের জন্য। সিভিলিয়ানরা আমাদের আত্মত্যাগের মর্ম বুঝে না। খুব দুঃখ জনক।”
মিথিলা ছাইবর্ণ মুখে টিফিনটার দিকে তাকালো। নড়ছে ওটা। ভেতরে নিশ্চই কমান্ডো চিফ ক্যাপ্টেন গেছো ব্যাঙ বসে আছেন!
বাবাই আগ্রহী মুখে খালামণির দিকে তাকালো, “খালামণি ফ্লাইট লেফটেনেন্ট কাকও আছে পরের অধ্যায়ে।”
শুঁকনো মুখে পৃষ্ঠা ওল্টালো মিথিলা। আড় চোখে বারবার টিফিনটার দিকে তাকাচ্ছে।
“ ফ্লাইট লেফটেনেন্ট কাকঃ
বাবাকোয়াদের বাসার নিচের কুকুরটা গত কয়েক সপ্তা হল চারটা ছানা ফুটিয়েছে। নাদুশ নুদুশ কুকুর ছানা। বাবাকোয়ার মিলিটারীতে “পশু সেবা” নামের কর্মসূচি আছে। সেজন্য আমি ছানাগুলোকে বাসায় এনেছিলাম খাওয়া দাওয়া ও প্রাথমিক বর্ণমালা শিক্ষা দেয়ার জন্য। ওদের মাও অনেক উৎসাহ প্রকাশ করেছিল আমার এই মহতি উদ্যোগকে। কিন্তু আম্মা বাবাকোয়ার সেই কর্মসূচি ধোলাই মেরে ছুটিয়ে দিয়েছে। আমার কান ধরে এমন মাইর দিয়েছে যে কানের লতি আধ ইঞ্চি লম্বা হয়ে গেছে। আমি মেপে দেখেছি স্কেল দিয়ে। এইটা কি উচিত? গরুদের কানের লতি লম্বা হয়- আমি কি গরু?
ছানা সহ ওদের মা’কে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে আম্মা। কর্ণেল বাবাকোয়া আম্মার ভয়ে তার পশু সেবা কর্মসূচি বাতিল করে দিয়েছে। বাসায় পশু সেবা করা যায় না।
তবে বাবাকোয়া নরম হৃদয়ের মানুষ। ছানা সহ ওদের আম্মাকে বের করে দেয়ায় কষ্ট পেয়ে বাবাকোয়া তাঁদের খুঁজে বের করেছে। ডাস্টবিনের পাশেই থাকে। বাবাকোয়া নিয়মিত কুকুর ছানাদের খাদ্য ও পুষ্টি শিক্ষার পাশাপাশি বর্ণমালা শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। যদিও বর্ণমালা শিক্ষার কোনো অগ্রগতি নাই। অ, আ, ক, খ কিছুই মনে থাকে না। ওদের প্রধান আগ্রহ খাওয়া দাওয়া আর লেজ কামড়ানো। তাঁদের পছন্দের খাবার হল হাড্ডি। বাবাকোয়া বাসায় থেকে হাড্ডি জাতীয় খাবার এনে ত্রাণ বিতরণ করে ছানাদের মধ্যে। তাদের গোসল করার জন্য একটা লাক্স সাবানও জোগার করে দিয়েছিলাম। কিন্তু ওরা লাক্স সাবান খেয়ে ফেলেছে। পেট ব্যথা সব ক’টার! পরে ওদের স্যালাইন খাওয়ানো নিয়ে কত ঝামেলা গেল!
মাঝে মাঝে ওদেরকে পুকুর পারে নিয়ে পুকুরের বিশালতার ওপর ক্লাস নেয় বাবাকোয়া। প্রকৃতির মহত্বও ওদের বোঝা প্রয়োজন। কুকুর হয় জন্মেছে বলে পুকুর পারের ঘাসে বাতাসের ঢেউ কি জিনিস- শিখবে না ওরা? পুকুরের পানিতে ছোট ছোট ঢেউ দেখাতে হয় মাঝে মাঝে। এতে মনে শান্তি আসে। মন উদার হয়।.........”
পড়তে পড়তেই মিথিলা চোখ বড় বড় করে বাবাইয়ের দিকে তাকায়। এই ছেলের ভাষা জ্ঞান এতটুকুন বয়সেই যে হারে পোক্ত হচ্ছে- ভবিষ্যতে বড় কিছু একটা করে ফেলবে!
আবার পড়তে থাকে মিথিলা-
“....... কুকুর ছানাদের ক্লাস নিতে গিয়েই পরিচয় হল ফ্লাইট লেফটেনেন্ট কাকের সঙ্গে। ডাস্টবিনে প্রায়ই নেমে এসে খাবার খায়। তার নিজেস্ব বিমান বাহিনী আছে। আমি তার সঙ্গে দিপাক্ষিক আলোচনায় বসেছি কয়েকবার। সে তার বিমান বাহিনী নিয়ে আমার সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কেবল আম্মার মধ্যেই যত অনাগ্রহ! ফ্লাইট লেফটেনেন্ট কাক ও তার প্লাটুনকে বাসায় দাওয়াত দিয়ে আনতে গিয়েই বিপদ! আম্মাকে শলার ঝাড়ু হাতে বাড়ি মারার জন্য ছুটে আসতে দেখে ফ্লাইট লেফটেনেন্ট কাক দুঃখ পেয়ে চলে গেছেন। তবে বাবাকয়াকে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি বাহিরে থেকেও বাবাকোয়ার বাহিনীর সঙ্গে কাজ করবেন।
কর্ণেল বাবাকোয়া দুঃখ পেয়েছে। আম্মুরা এমন কেন?”
পৃষ্ঠা ওল্টালো মিথিলা। প্রতি পৃষ্ঠাতেই নানা উদ্ভট সব কান্ড কারখানার বিবরণ। তার মাঝে একটা জায়গায় লেখা-
“ মিশন নং – ১১২
জেনারেটর আর হারিকেনের মত পেট্রল কিম্বা কেরসিন তেল দিয়ে টিভি চালানো যায় না। আজকে কারেন্ট চলে যাওয়ার পর কর্ণেল বাবাকোয়া রান্নাঘর থেকে কেরসিনের জারিকেন এনে টিভি’র উপরের ফাঁক দিয়ে ঢেলে টিভি চালানোর চেষ্টা করেছে। চলেনি। পেট্রল থাকলে মনে হয় চলতো।
পরে কারেন্ট আসে রাত দশটায়। খাবারের ঘর থেকেই শুনতে পেলাম টিভি রুমে বোমা হামলা হয়েছে। বাবাকোয়া তার প্লাটুন নিয়ে সেখানে পৌছে দেখে টিভিতে আগুণ ধরে গেছে! আমি মগে পানি এনে টিভির আগুণ নিভাতে গিয়েছিলাম। আম্মা কান ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেছে! পানি ঢাললে কি হয়? আগুণ নিভানো ভালো না?
বাবাকোয়ার মন খারাপ। মেজর মুরগীর লোম পুঁড়ে গেছে অনেক এই অগ্নিকান্ডে। আম্মার হাসপাতালের বার্নিং ওয়ার্ডে ভর্তি এখন।.........”
হাসি চাপতে চাপতে বাবাকোয়ার দিকে তাকালো মিথিলা। গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে বাবাই। হাসছে না একদম।
লেখা পাতার শেষ পৃষ্ঠায় যখন এলো- বাবাই চুপচাপ উঠে চলে গেল ভেতরের ঘরে। বাবলিও কোল থেকে নেমে বাবাইয়ের পেছন পেছন হামাগুড়ি দিয়ে চলে গেল।
মিথিলা সামান্য অবাক হয়ে দেখল শেষ অংশে লেখা-
“কর্ণেল বাবাকোয়া ও আম্মার মন খুব খুব খারাপ। বাবার অনেক জ্বর। সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকে চাদর গায়ে দিয়ে। বাবাকোয়ার অসুখের সময় বাবা সারাদিন রাত কোলে নিয়ে বসে থাকে তাকে। বাবাকোয়া পারে না, বাবাকোয়া ছোট........”
মিথিলা ডায়েরী বন্ধ করে বেরিয়ে এল টেবিলের নিচ থেকে। দুলাভাইয়ের ঘরে উঁকি দিল। বাবাই আর বাবলি বিছানার কাছে চলে গেছে। বাবলিকে ঠেলে ঠুলে বিছানায় তোলার চেষ্টা করছে বাবাই। জাহিদ গায়ে চাদর দিয়ে কুকুর কুন্ডলী হয়ে শুয়ে আছে। নোভেরা বিছানাতে গম্ভীর মুখে আধ শোয়া হয়ে রয়েছে। কাঁদছে; খানিক পর পর চোখ মুছছে। মিথিলাকে দেখে নোভেরা সোজা হতেই ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে শব্দ করতে নিষেধ করলো মিথিলা। নিঃশব্দে এসে জাহিদের কপালে হাত দিয়ে জ্বর দেখলো। নোভেরার হাতে আলতো চাপ দিয়ে সান্ত্বনা দিল, নিচু স্বরে বলল, “জ্বর সেরে যাবে ইনশাল্লাহ্। ভাবিস না আপু। ঘর দোর তো সব এলোমেলো হয়ে আছে। আমি গেলাম ঠিক করতে। তুই ভাইয়ার কাছে থাক এখানে।” নোভেরাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চলে এলো মিথিলা। অনেক কাজ। রান্না বান্না কিছুই হয়নি। ওড়না কোমরে পেঁচিয়ে লেগে গেল কাজে।
জ্বরের ঘোরে থেকে থেকে কাঁপছে জাহিদ। ঠিক মত ঘুমাতে পারছে না। আধো জাগরণের মধ্যে রয়েছে। তার মাঝেই টের পেল তুলতুলে নরম দুটো শরীর ওর গা ঘেষে এসে শুয়ে পড়েছে। চোখের পাতা আগুণ গরম। খোলা যাচ্ছে না। তারপরও জ্বর নিয়ে চোখ মেলল। নোভেরা গম্ভীর মুখে ওর ঠোঁটে থার্মোমিটার গুজে দিল সাথে সাথে। পাঁচ মিনিট পর পর করছে এটা।
থার্মোমিটার মুখে নিতেই ঘোরটা সামান্য কাটল জাহিদের। অবাক হয়ে দেখলো চাদরের নিচে বাবাই আর বাবলি ওকে দু’দিক থেকে জড়িয়ে ধরে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। সে তাকাতেই বাবাই বিজ্ঞের গলায় বলল, “বাবা, তোমার গা অনেক গরম তো, তাই ঘেষে শুয়েছি। তাহলে তাপ ভাগাভাগি করে চলে আসবে না? হ্যাঁ?”
বাবলি কেবল ওর দাঁত চারটা বের করে হাসল আনন্দিত মুখে।
জাহিদ দীর্ঘ একটা মুহূর্ত ছেলে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দু হাতে ওদের টেনে নিল কাছে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখল।
নোভেরার দিকে তাকাতেই দেখল ও চোখের পানি আড়াল করার চেষ্টা করছে অন্যদিকে তাকিয়ে। তার একটু কিছু হলেই এই মেয়েটা কান্না কাটি লাগিয়ে দেয়।
“বেগাম?” দূর্বল ভাবে হাসল, “এত ভালবাসার মাঝে আনন্দ-অশ্রু কেন? আমার বুকের অ্যাপার্টমেন্টের জায়গা প্রচুর। আরেকজন ধরে যাবে!” জ্বর নিয়ে হাত প্রশারিত করল জাহিদ। নোভেরা অন্যদিকে তাকিয়ে ধমক দিল চোখ মুছতে মুছতে, “ছিঃ বাচ্চাদের সামনে কি এসব?”
জাহিদ উদার ভাবে হাসতে হাসতে বলল,
“ইন্দ্র আমায় বলল ডেকে
স্বর্গে ফিরে আয়?
কেমনে বলি চোরাকাঁটা
বিঁধেছে মোর পায়।”
লাল চোখে জাহিদের দিকে তাকালো নোভেরা। চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে কেঁদে কেঁদে। জাহিদ ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “কাঁদলেও দেখি তোমাকে সুন্দর লাগে বেগাম!”
নোভেরা গুটিসুটি মেরে জাহিদের বুকে মাথা রাখল বাবাইদের মত, “কবিতাটার মানে কি?”
“স্রষ্টা আমাকে স্বর্গে ফিরে যেতে বলছে। কিন্তু আমি বলছি উল্টো কথা- আমার পায়ে চোরাকাঁটা বিঁধেছে। মানে অন্য কোথাও আটকা পড়েছি। তোমরা হলে সেই তিনটা চোরাকাঁটা; কর্ণেল বাবাকোয়া, আলুবতী আনন্দময়ী আর বেগাম! কি লাগে আর এক জীবনে?” হাসতে লাগল জাহিদ। জ্বরটা কমে গেছে অনেক হঠাৎ করেই। বাবাইয়ের কথা মত তাপ ভাগাভাগি হয়ে যাচ্ছে নাকি!
বাবাকোয়া অবাক হয়ে দেখল আম্মু বাবাকে শক্ত করে ধরে আছে। মিষ্টি করে হাসছে লাজুক মুখে। বাবাকোয়া মিলিটারী-ছোট মানুষ। এসব দেখতে হয় না। বাবাকোয়া চোখ বন্ধ করে থাকল। মিলিটারীতে বাবার মত কবিতা কর্মসূচি চালু করা উচিত- এ জাতীয় চিন্তা ভাবনা করা কেবল শুরু করেছিল বাবাই।
কিন্তু বাবলি এর মাঝেই বেরসিকের মত গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিল, প্রথম বারের মত কথা বলে উঠল, “আলু দেউ!!!!”
জাহিদ বিস্মিত হয়ে বলল, “ওরে! প্রথম কথা বললি! তাও আবার ‘আলু দেউ’?”
উৎসর্গঃ
পৃথিবীর সমস্ত বাবা-মা'কে। যারা পরম মমতায় আমাদের "বাবাকোয়া ছেলে বেলা"র সব দুষ্টুমী গুলো হাসি মুখে সয়ে নিতেন।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে এপ্রিল, ২০১২ রাত ১০:১৪