প্রথমেই বলে নেই, ইসলাম ধর্ম খুব সহজ পালনীয় একটা জীবনবিধান, অপরপক্ষে খুব কঠিন এর অনুশাসনগুলো। ইসলাম ধর্মের রীতিনীতি গুলো সহজ না কঠিন এটা নির্ভর করবে সম্পূর্ণ আপনার চিন্তাধারার উপর। আপনি যদি চান যে ইসলাম ধর্মের প্রতিটি নিয়ম কানুন আপনি যথাযথ ভাবে মেনে চলবেন, যদি এটা ফিল করতে পারেন যে আমিতো সৃষ্টি সুতরাং স্রষ্টার নির্দেশাবলী আমাকে মানতে হবে (আচ্ছা আসলেই মানা উচিৎ নয় কি?), যদি অহংকারবিহীন এই চিন্তাধারায় উপনীত হতে পারেন যে ন্যায় অন্যায়ের সাম্যতা রক্ষা করার জন্য কেউ একজন আমাদের কর্মকাণ্ডের হিসাব রাখছে তাহলে দেখবেন আপনার কাছে ইসলাম ধর্মের প্রতিটি অনুশাসন সহজ মনে হচ্ছে। সাময়িক কোন নির্দেশনা মেনে চলতে আপনার কষ্ট হতে পারে কিন্তু আপনার জিবনেরই বৃহৎ স্বার্থের দিকে, মানবতার দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখবেন ইসলাম ধর্মের প্রতিটি অনুশাসন সম্পূর্ণরূপে আদর্শ অনুশাসন।
অপরপক্ষে আপনি যদি সেক্যুলার হন অথবা অ্যাথেইস্ট কিনবা ধর্ম বিদ্ধেষি তাহলে দেখবেন ইসলাম ধর্মের প্রতিটি অনুশাসন পালন করা আপনার জন্য কষ্টসাধ্য হবে (আদতে কিন্তু তা নয়), এটা সম্পূর্ণই আপনার চিন্তাধারার ভুল। আপনি ফিক্সড করে নিয়েছেন যে আপনি ধর্মের অনুশাসন মানবেন না, আপনাকে যেভাবেই বোঝানো হোক না কেন, এতে যতই মানব উপকারি দিক থাকুক না কেন আপনি সেগুলো মানবেনই না!
ইসলাম ধরমে আংশিক মান্যতার কোন সুযোগ আছে?
ইসলাম ধর্মে আংশিক মান্যতার কোন সুযোগ নেই। আপনি নামাজ পরবেন তো রোজা রাখবেন না, রোজা রাখবেন তো যাকাত দিবেন না, হজ্জ্ব আদায় করবেন কিন্তু গরীবদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন না, এরকম কোন সুযোগ আপনি ইসলামে পাবেন না। আপনাকে ইসলাম মানতে হবে এবং তা সম্পূর্ণরূপেই মানতে হবে।
আজকে রোজা রাখার ব্যাপারে, রোজার প্রধান উদ্দেশ্য নিয়ে দুটি কথা বলব, আশা করছি সেগুলো মন দিয়ে পড়ে একটু উপলব্ধি করার চেষ্টা করবেন।
রোজা মানে কি?
রোজা মানে হল......... । আচ্ছা সংজ্ঞায়ন করাটা কি খুব জরুরী? চলুন একটু ভিন্ন ভাবে ভাবতে শিখি। রোজার উপকারী দিক গুলোর প্রতি একটু দৃষ্টিপাত করে আসি। দেখি কিছু বিষয় পরিষ্কার হয় কিনা।
ক/ রোজা আপনাকে ধৈর্য ধরতে শিখাবে। (ইফতার সামনে নিয়ে বসে থেকেও সময় হয়নি বলে না খেয়ে থেকে সময় হওয়ার জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা।)
খ/ রোজা আপনাকে নিয়মানুবর্তিতা শিখাবে। (প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে উঠে সেহেরী খাওয়া।
গ/ রোজা আপনাকে সাম্যতা শিখাবে। (সারাদিন না খেয়ে থাকার ফলে গরিব দুঃখীদের কষ্ট অনুভব করার একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়। যার দরুন অন্য সময়ে তাদের কষ্টের প্রতিদান দিতে উৎসাহী হবেন। কষ্টটা ফিল করতে পারবেন। একটা সাম্যতা সৃষ্টির উপায় হল এই রমজান মাস।)
ঘ/ পাপ পুণ্যের মধ্যকার পার্থক্য অনুভব করতে শিখায়।
আরো অনেক গুণাবলী অর্জন করে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। তবে আপাতত গভীর আলোচনায় যাচ্ছিনা। শেষ পয়েন্টটা নিয়ে একটু বিশদ আলোচনা করি।
১/ এই তুই ঐ মাইয়ার দিকে এমন ফ্যালফ্যাল করে তাকায়া আছিস কেন? তুইনা রোজা আছিস, রোজা হালকা হয়ে যাবেতো।
২/ ফাহাদের কথা আর বলিসনা, ও রমজান মাসেও এতো স্ল্যাং ইউজ করে মনে হয় যে রোজাই রাখেনা।
৩/ ঢাকার কোন এক ব্রডব্যান্ড প্রোভাইডার রমজান মাস উপলক্ষে তার সাইটের সকল এডাল্ট কন্টেন্ট গ্রাহকদের জন্য নিষিদ্ধ করে দিয়েছে।
৪/ আচ্ছা বোন, রমজান মাস, রোজা রেখেছিস একটু নিজেকে পরিপূর্ণ ভাবে আবৃত করে রাস্তায় বের হলে খুব বেশি নারীর অধিকারের উপর পুরুষের কর্তৃত্বের প্রকাশ হবে কি?
৫/ মফিজ সাহেব, রোজা রেখেছি। সম্মানীটা (ঘুস বা সুদের টাকা) রাতে নিয়ে ভালো হয় না কি? আপনি না পারেন তখন কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েন।
৬/ নাফিসাকে দিয়ে বেশি কাজ করাইয়োনা। মেয়েটা রোজা রেখেছে, ওর ও তো একটু বিশ্রাম নিতে পারলে ভালো হত।
৭/ দোস্ত, অমুক সাইটে তমুক সমস্যায় পরেছি একটু তাড়াতাড়ি দেখত সমাধানটা করতে পারিস কিনা। খুব ঝামেলায় পরে যাব নয় তো!
-দোস্ত, এখন দেড়টা বাজে। জামায়াতের (যোহর নামাজের) সময় হয়ে গেছে। নামাজ পরে এসে তোকে আমি ফোন করব।
একটু ভাবুন, দেখবেন উল্লেখিত প্রতিটা কথার সাথে আমরা বাস্তবিক জীবনে পরিচিত। রমজান মাস আসলে আমাদের সবার মধ্যে সামগ্রিকভাবে এই পরিবর্তন গুলো লক্ষণীয় হয়।
আচ্ছা আমরা চাইলেই কি পারিনা রমজান মাসের মত অন্যান্য মাসেও নিজেদের দৃষ্টিকে হেফাজত করে চলতে?
পারি, আমরা পারি। সবই পারি। শুধুমাত্র ইচ্ছে করলেই পারি। তবে ইচ্ছেটা হতে হবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে এবং কিছু ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে। অনেকেইই বলে নিজে ঠিক থাকলে সব ঠিক আমি বলি পারিপার্শ্বিকতা ঠিক থাকলে নিজ ও ঠিক।
আসেন একটু পরীক্ষার হল থেকে ঘুরে আসি!
ফাহিম, তুহিন আর আরফান। তিন বন্ধু। ফাহিম পরীক্ষায় কোন মতসে পাস করেছে। তুহিন পেয়েছে ৮০% মার্ক্স, সুতরাং বোর্ড কর্তৃক সেরা গ্রেডেই নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছে। অপরপক্ষে আরফান পেয়েছে ১০০% মারক্স। সেও তুহিন এর মত বোর্ড কর্তৃক প্রদত্ত সেরা গ্রেডেরই অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু তাই বলে কি তুহিন ও আরফান এর ফলাফলের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকবেনা! প্রাথমিক বিবেচনায় ফাহিম ও পাস হওয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে তুহিন ও আরফান এর সমকক্ষ। আসলে সেই সমকক্ষতা অর্জনের মূল্যায়ন কি আমরা মানুষ হয়েও অপর মানুষকে আদৌ করি?
-করি না।
উপরের কথা গুলোর দ্বারা যেমনিভাবে আপনি রোজা হালকা হয়ে যাওয়ার ব্যপারে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছেন, তেমনিভাবে নিচের লেখাগুলো আপনাকে সাহায্য করবে রোজার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাপারগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে।
আমাদেরকে কোন পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হলে প্রথমে টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়,তারপর ফর্মফিলাপের দ্বারা একপ্রকার চুক্তিবদ্ধ হতে হয়। না হয় পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগই দেওয়া হয়না। যখন সুযোগই দেওয়া হয়না আপনি সে পরীক্ষায় তখন কিভাবে উত্তীর্ণ হবেন?!
ঠিক তেমনিভাবে আপনার রোজা যথাযথভাবে হওয়ার জন্য আপনাকে প্রথমে তারাবীর নামাজ (টেস্ট পরীক্ষার মত) আদায় করতে হবে। তারপর নিয়ত (ফর্ম ফিলাপের মত) করতে হবে। এতো কষ্ট করে পরীক্ষা দিয়েছেন আর রেজাল্ট পেয়ে একটু মিষ্টিমুখ করবেন না তা কি হয়? তাহলে একটু ইফতারের আয়োজন টাকে আপনারা এতটা আহামরিভাবে নিচ্ছেন কেন!!!
আচ্ছা ইসলাম ধর্মের নিয়ম গুলো এতো উদ্ভট কেন? শেষ রাত্রে ঘুম থেকে উঠে খেতে হয়!
আপনি মানুষ হয়ে যদি মনুষ্য নিয়ম করা পরীক্ষার কেন্দ্রে উপস্থিত হতে পারেন নির্দিষ্ট সময়ের ও অনেক আগে একটা বিস্তর রাস্তার বিশাল জ্যাম পারি দিয়ে, সেখানে আপনি কিভাবে আলোচনা সমালোচনা করেন সেহেরিরি সময়টা এতো নিশি রাত্রে হয়েছে বলে যেখানে এই নিয়মটা স্বয়ং স্রষ্টা প্রদত্ত!!!
রোজা রেখে কোন মহিলার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাবেন, চায়ের আড্ডায় অপরের নামে গীবত করে বেড়াবেন, ধূমপানের মুহূর্তে অকথ্য ভাষায় স্ল্যাং ইউজ করবেন, রোজা রেখেছেন বলে পিয়নের দ্বারা সুদের টাকা গ্রহণ করবেন, দিনে রোজা রাখবেন আর সারারাত অসৎ প্রেমের পিছনে সময় দিয়ে সেটার উসুল করবেন, রমজানে মানুষের নিত্যনতুন চাহিদা সৃষ্টি হয় বলে দ্রব্যমূল্যের আকাশছোঁয়া দাম নির্ধারণ করবেন, শুধু রমজান মাস বলেই মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার গুরুত্ব উপলব্ধি করবেন আর অন্যান্য মাসে সেসব অস্বীকার করবেন, রোজা আছেন বলে নামাজ পরছেন সাথে সেলফ মার্কেটিং ও করছেন অপরপক্ষে বাকি ১১ মাসে ধর্মের প্রতি আনুগত্বশীলতার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবেন না, দিনে রোজাদার বলে নিজেকে পরিচিত করাবেন আর রাতে কোন এক পতিতালয়ের খদ্দের হয়ে যাবেন, আংশিক ধর্ম পালনে উদ্ভুদ্ধ হবেন সাথে নিজেকে বেপরোয়া ভাবে (নগ্ন, অর্ধ-নগ্ন) প্রকাশ করবেন.........
আর ভাববেনঃ আপনার রোজা কবুল হয়ে যাবে! কখনোই না।
রোজা রেখে যদি রমজান মাসের শিক্ষা যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে না পারেন এবং যে কারণেই হোক সেইসব শিক্ষা বাস্তবিক জীবনে প্রতিফলিত করতে ব্যর্থ হন, তাহলে আপনার রোজা কখনোর জন্যই কবুল হবেনা। আপনাকে তখন বলা যায়, আপনি রোজার নাম করে আদতে সারাদিন উপোস করেছেন!