somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

‘আত্মকথা ১৯৭১’ ::: নির্মলেন্দু গুণের জবানবন্দী

১৮ ই জুন, ২০০৮ সকাল ১১:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
অন্ধকারে হালকা আলো পড়া একটি মুখ, দুটো চোখের সামনে চশমার স্বচ্ছ কাচের আবরণী, কিন্তু দৃষ্টি প্রসারিত চশমার ফাঁক দিয়ে উন্মুক্ত বাংলাদেশে। সেই চোখ দুটোতে প্রিয়জন হারানোর বেদনা, অতীত খুঁড়ে বীভৎসতা বলার কষ্ট, জন্মচেতনা থেকে ক্রমাগত বিচ্যুত হতে থাকা মানুষকে ফিরিয়ে আনার সংকল্প- সব মিলিয়ে প্রচ্ছদপটে যে নির্মলেন্দু গুণ উঠে এসেছেন, সেটি প্রকৃতপক্ষে আমার ছবি, আপনার ছবি, মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করা আমাদের সম্মিলিত ছবি। সেই ছবি যুদ্ধাপরাধী-রাজাকার-ইতিহাসবিকৃতিকারী ও তাদের আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও প্রতিবাদের ছবি।

বলছিলাম নির্মলেন্দু গুণের লেখা বই ‘আত্মকথা ১৯৭১’-এর কথা।

মার্কসের মতে, পৃথিবীর ইতিহাস যদিও শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস হওয়ার কথা, কিন্তু আমাদের অ্যাকাডেমিক জীবনে ইতিহাস মানে যুদ্ধ, ইতিহাস মানে রক্তপাত এবং বিজয়ীর কথা। কিন্তু ইতিহাস আসলে নিজেই পক্ষপাতদুষ্ট এক অভিধা। যে কারণে যুগে যুগে রচিত হওয়া যে ইতিহাস আমরা শুনে আসছি, সেই ইতিহাস আসলে যুদ্ধের সেনাদের চাইতে, যুদ্ধে প্রভাবিত হওয়া জনমানুষের চাইতে নেতৃত্ব দেওয়া জয়ী বীরদের কথা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও এই ডিসকোর্স থেকে বেরুতে পারে নি। ফলে বিভিন্ন বই-গবেষণা-আখ্যানে আমরা যে মুক্তিযুদ্ধের সন্ধান পাই, সেখানে সাধারণ মানুষের কষ্ট, আত্মত্যাগ ও তাদের জীবনযাত্রায় যুদ্ধের প্রভাবের কথা যতোটুকু উঠে এসেছে, তার চাইতে সহস্রগুণ বেশি উঠে এসেছে সম্মুখ সমরের যোদ্ধাদের কথা। সম্মুখ সমরের যোদ্ধাদের কথা যতোটুকু এসেছে, তারও সহস্রগুণ এসেছে তাদের নেতৃত্ব দেওয়া বীরদের কথা। অথচ সরাসরি যুদ্ধ যতোটুকু ইতিহাসের পাঠ, জনমানসে তার প্রভাবের ইতিহাস তার চাইতে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কম গুরুত্বপূর্ণ নয় ছোট ছোট লড়াইয়ের ঘটনাগুলোও। একটি আরেকটির চাইতে বড় কিংবা ছোট নয়, ইতিহাসের এই দুটো ধারা আসলে একে অপরের পরিপূরক। একটিকে ভালো করে বুঝতে চাইলে আরেকটিকে কোনোমতেই বাদ দিয়ে ইতিহাস তৈরি করা যাবে না।

দুঃখজনক হলেও সত্য, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের অপ্রতুল। যতোটুকু আছে তারও অনেকখানি বিকৃত করা হয়েছে। যার যতোটুকু প্রাপ্য, রাজনৈতিক ও বৈষয়িক মোহে তাকে তার চাইতে বেশি দেয়া হয়েছে। ফলে একপেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দিন দিন নতুন প্রজন্মকে বিমুখ করেছে, আমরা বেড়ে উঠছি আমাদের জন্মইতিহাসকে না জেনে, তাকে উপেক্ষা করে।

নির্মলেন্দু গুণের ‘আত্মকথা ১৯৭১’ ঠিক সে কারণেই আলাদা হয়ে ধরা দিয়েছে এ প্রজন্মের পাঠকের কাছে। প্রকাশে তিনি গদ্যকার, স্বভাবে কবি, মননে দুটোর মিশেল। ফলে অনুপম ভাষা দিয়ে তিনি যেভাবে আত্মকথায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে তুলে এনেছেন, তা আমাদের দুটো চাহিদাকেই পূরণ করে। অ্যাকাডেমিক ইতিহাস লেখার ধারা অনুসরণ না করেও তিনি একাধারে যেমন তুলে এনেছেন সে সময়কার ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো, তেমনি বইয়ের অধিকাংশ পৃষ্ঠায় মিশে আছে সাধারণ মানুষের যাতনা ও আনন্দের ঘটনাগুলো। তিনি বইটিতে যেমন দেখিয়েছেন কীভাবে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অনেকের মতো গুরুত্বপূর্ণ একজন হয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেছিলেন, তেমনি তুলে এনেছেন বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জের গণহত্যার অজানা কথা। তিনি যেমন মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের নথি থেকে তুলে দিয়েছেন সে সময়কার কিছু ঘটনাপ্রবাহের কথা, তেমনি যুদ্ধকালীন অবস্থায় রাস্তায় রাস্তায় মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কথাও। ফলে ইতিহাসের দুটি ধারাই তার মধ্যে সচেতনভাবে প্রবাহিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে আমাদের মতো বিভ্রান্তের ঘূর্ণিপাকে অবস্থানকারীদের সামনে।

আমরা যদি কেউ জানতে চাই যুদ্ধের সম্মুখ সমরের মতো মঞ্চের পেছনে সাধারণ মানুষের ভূমিকার কথা, তাহলে এই বইটি আমাদের পড়তে হবে। আমরা যদি চাই সে সময়কার মানুষের চিন্তন প্রক্রিয়ার কথা, তাহলে আমাদেরকে বইটি পড়তে হবে। আমরা যদি চাই নিজেদের জন্মচেতনাকে জেনে তাকে অনুভবে প্রতিষ্ঠিত করতে তাহলে এই বইটি আমাদের অবশ্যপাঠ্য।

এই বইটি অবশ্যপাঠ্য তাদেরও- স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিভ্রান্তি রয়ে গেছে যাদের।
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রসঙ্গঃ নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় বাংলাদেশ চ্যাপ্টার.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৫ রাত ১০:৫৮

বাংলাদেশ সম্পর্কে নিউইয়র্ক টাইমস এর নিউজটা যথাসময়েই পড়েছিলাম। নিজের মতো করে রিপোর্টের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট লিখতেও শুরু করে ছিলাম। কিন্তু চোখের সমস্যার জন্য বিষয়টা শেষ করতে পারিনি।

এবার দেখা যাক বাংলাদেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশী রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত ট্যারিফ নিয়ে যত ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৫ সকাল ৮:৪১


আমাদের রাষ্ট্রপতি মহোদয় জনাব ট্রাম্প আজ বিকেলেই সম্ভবত ৫০ টিরও বেশী দেশের আমদানীকৃত পণ্যের উপর নতুন শুল্ক বসানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনিও একটি তালিকাও প্রদর্শন করেছেন। হোয়াইট হাউসের এক্স... ...বাকিটুকু পড়ুন

শুদ্ধতার আলোতে ইতিহাস: নবী মুহাম্মদ (ﷺ) ও উম্মে হানীর (رضي الله عنها) বাস্তবতা

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৫ সকাল ৯:৩০


প্রতিকী ছবি

সম্প্রতি ইউটিউবার ইমরান বশির তাঁর এক ভিডিওতে নবী মুহাম্মদ (ﷺ) ও উম্মে হানী (رضي الله عنها)-এর সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

এই দেশ থেকে রাজনৈতিক অন্ধকার দূর করা যায় কিভাবে?

লিখেছেন গেঁয়ো ভূত, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৫ সকাল ১০:১৪

রাজনৈতিক অন্ধকার দূর করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং চ্যালেঞ্জিং বিষয়, যা দেশের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য অপরিহার্য। এই সমস্যা সমাধানে দেশের নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল, শিক্ষাব্যবস্থা, এবং প্রশাসনের যৌথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ : নানা মুনীর নানা মত !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৫ দুপুর ১:২২


ডোনাল্ড ট্রাম্পের রপ্তানি পণ্যের উপর শুল্ক আরোপের ঘটনায় দেশজুড়ে উচ্চশিক্ষিত বিবেকবান শ্রেনীর মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়েছে। আমরা যারা আম-জনতা তারা এখনো বুঝতে পারছি না ডোনাল্ড ট্রাম্প কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×