
৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৫৪ এর যুক্তফ্রন্টের বিজয়, ৬৬ এর ছয়দফা আন্দোলন, ৬৮ এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বিরুদ্ধে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আন্দোলন, ৬৯ এর গন অভ্যুথ্থান, ৭০ এর নির্বাচনে বিজয়, ৭১ এর অগ্নিঝরা মার্চের অসহযোগ আন্দোলনসহ সকল গন্তান্ত্রিক এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ছিল আমাদের প্রিয় এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তাই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাতে বাঙালিদের দমনের অভিযান অপারেশন সার্চ লাইট শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমনকারী পাকিস্তান বাহিনীতে ছিল ১৮ নং পাঞ্জাব, ২২ নং বেলুচ, এবং ৩২ নং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের বিভিন্ন ব্যাটেলিয়ন। ২৫ মার্চের রাত থেকে ২৭ মার্চ সকাল পর্যন্ত এ বিশেষ মোবাইল বাহিনী স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, ট্যাংক বিধ্বংসী বিকয়েললস রাইফেল, রকেট লাঞ্চার মার্টার ভারি ও হালকা মেশিনগানে সজ্জিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে ফেলে। পশ্চিম দিক থেকে রেললাইন জুড়ে ৪১ ইউনিট, দক্ষিণ দিক জুড়ে ৮৮ ইউনিট এবং উত্তর দিক থেকে ২৬ ইউনিট কাজ শুরু করে। শুরু হয় বিশ্বের মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ানক ও ভয়ংকর গনহত্যা। তারা একে একে হত্যা করে আমাদের দেশের সূর্য সন্তান আমাদের শিক্ষক, আমাদের ছাত্রদের। এখনেই শেষ হয়ে যায় নি ইতিহাসের ঘৃণ্য এই গনহত্যা। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি যখন আমাদের স্বাধীনতার সূর্য উদীয়মান, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল বদর, আল শামছরা শুরু করে দ্বিতীয় দফা গনহত্যা। ১৪ ডিসেম্বর তারা আমাদের জাতিকে মেধাশুন্য করার মানসে একে একে বাসা থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করে আমাদের শিক্ষক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী সূর্যসন্তানদের।
শিক্ষক হত্যাঃ
২৫শে মার্চের কালরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৯ জন শিক্ষককে হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফজলুর রহমান। তাকে তার বাসায় দুই আত্নীয়সহ হত্যা করা হয়। ফুলার রোডের ১২নং বাড়িতে হানা দিয়ে হানাদাররা নামিয়ে নিয়ে যায় অধ্যাপক সৈয়দ আলী নকিকে (সমাজ বিজ্ঞান)। তাঁকে গুলি করতে গিয়েও, পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং উপরের তলার ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মুহম্মদ মুকতাদিরকে গুলি করে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। ২৭শে মার্চ অধ্যাপক মুকতাদিরের লাশ পাওয়া যায় ইকবাল হলে (বর্তমান জহুরুল হক হল), তাকে পরে প্লটনে এক আত্মীয়ের বাড়িতে দাফন করা হয়। সলিমুল্লাহ হল এবং ঢাকা হলে (বর্তমান শহীদুল্লাহ্ হল) হানা দিয়ে সলিমুল্লাহ হলের হাউস টিউটর ইংরেজীর অধ্যাপক কে এম মুনিমকে সেনারা প্রহার করে এবং ঢাকা হলে হত্যা করে গণিতের অধ্যাপক এ আর খান খাদিম আর অধ্যাপক শরাফত আলীকে। জগন্নাথ হলের মাঠের শেষ প্রান্তে অধ্যাপকদের বাংলোতে ঢুকে তারা অর্থনীতির অধ্যাপক মীর্জা হুদা এবং শহীদ মিনার এলাকায় ইতিহাসের অধ্যাপক মফিজুল্লাহ কবীরের বাড়িতে ঢুকে তাঁদের নাজেহাল করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর যে সব সম্মানিত শিক্ষক শহীদ হনঃ
১. গিয়াসউদ্দিন আহমেদ
২. ডঃ এ. এন. এম. মনিরুজ্জামান
৩. ডঃ জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা
৪. এ. এন. মুনীর চৌধুরী
৫. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী
৬. ডঃ আবুল খায়ের
৭. ডঃ সিরাজুল হক খান
৮. রাশীদুল হাসান
৯. আনোয়ার পাশা
১০. ডঃ জি. সি. দেব
১১. ডঃ ফজলুর রহমান
১২. ডঃ ফয়জুল মহি
১৩. আব্দুল মুকতাদির
১৪. শরাফৎ আলী
১৫. সাদত আলী
১৬. এ. আর. খান খাদিম
১৭. সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য
১৮. অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য
১৯. মোহাম্মদ সাদেক (ইউনিভার্সিটি ল্যাবটরি স্কুল)
২০. ডাঃ মোহাম্মদ মর্তুজা (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান মেডিক্যাল অফিসার)
ছাত্র ছাত্রী হত্যাঃ
১৯৭১ এর মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলিতে “স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের” কর্মকান্ড পরিচালিত হত ইকবাল হল (পর সার্জেন্ট জহুরূল হক হল থেকে)। পাকিস্তানি অপারেশন সার্চ লাইটের ১নং লক্ষ্যবন্তু ছিল জহুরুল হক হল। ২৫ মার্চের মধ্যরাতের পূর্বে ছাত্র লীগের প্রায় সব নেতাকর্মী হল ছেড়ে যান। সেদিন রাত থেকে ২৬ মার্চ সারা দিন রাত ঐ হলের উপর নীলক্ষেত রোড থেকে মার্টার, রকেট লঞ্চার, রিকয়েলস রাইফেল এবং ভারী মেশিন গান ও ট্যাংক থেকে প্রচন্ড আক্রমন পরিচালিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কে এ মুনিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭১-৭২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে লিখেছিলেন, শুধু জহুরুল হক হলেই প্রায় ২০০ ছাত্র নিহত হন।
রাত বারটার পর ইউওটিসি এর দিকের দেয়াল ভেঙ্গে পাকবাহিনী ট্যাংক নিয়ে জগন্নাথ হলের মধ্যে প্রবেশ করে এবং প্রথমেই মর্টার ছোড়ে উত্তর বাড়ির দিকে। সাথে সাথে অজস্র গুলিবর্ষণ শুরু হয়। তারা ঢুকে পড়ে জগন্নাথ হলে। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে বাড়ির প্রতিটি কক্ষ অনুসন্ধান করে ছাত্রদের নির্বিচারে গুলি করে। সে রাতে জগন্নাথ হলে ৩৪ জন ছাত্র শহীদ হয়। জগন্নাথ হলের কিছু ছাত্র তখন রমনার কালী বাড়িতে থাকত। ফলে, প্রায় ৫/৬ জন ছাত্র সে রাতে সেখানে নিহত হয়। এদের মধ্যে শুধু অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র রমনীমোহন ভট্টাচার্য ব্যতীত অন্যদের নাম জানা যায় না। এছাড়া বহু সংখ্যাক অতিথিও নিহত হয় এদের মধ্যে ভৈরব কলেজের হেলাল, বাজিতপুর কলেজের বাবুল পাল, জগন্নাথ কলেজের বদরুদ্দোজা, নেত্রকোনার জীবন সরকার, মোস্তাক, বাচ্চু ও অমরের নাম জানা যায়।
১৯৭১ সালের মার্চে ঢাকার মার্কিন কনসাল আর্চার কে ব্লাডের লেখা গ্রন্থ, “দি ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ” থেকে জানা যায় সে রাতে রোকেয়া হলে আগুন ধরানো হয়েছিল এবং ছাত্রীরা হল থেকে দৌড়ে বের হবার সময় মেশিন গান দিয়ে গুলি করা হয়। ২৬ মার্চ সকালের দিকে সেনাবাহিনীর কন্ট্রোল রুম ও ৮৮ ইউনিটের মধ্যে যে কথোপকোথন হয় তা থেকে জানা যায় ক্যাম্পাসে প্রায় ৩০০ ছাত্র নিহত হয়।
কর্মচারী হত্যা
জহুরুল হক হল আক্রমনকারী বাহিনী ব্রিটিশ কাউন্সিল প্রহরারত ইপিআর সদস্যদের পৈশাচিকভাবে হত্যা করে। তারা শিক্ষকদের ক্লাব লাউঞ্জে আশ্রয়গ্রহণকারী ক্লাব কর্মচারী সিরাজুল হক, আলী হোসেন, সোহরাব আলি গাজী এবং আবদুল মজিদকে হত্যা করে। টিএসসিতে নিহত কর্মচারীরা ছিলেন আবদুস সামাদ, আবদুস শহীদ, লাড্ডু লাল। রোকেয়া হল চত্তরে নিহত হন আহমদ আলী, আবদুল খালেক, নমী, মো: সোলায়মান খান, মোঃ নুরুল ইসলাম্, মোঃ হাফিজউদ্দিন, মোঃ চুন্নু মিয়া এবং তাদের পরিবার পরিজন।
যে বাহিনী শহীদ মিনার ও বাংলা একাডেমী আক্রমন করে তারাই ঢাকা হল (বর্তমানে শহীদুল্লাহ হল) সংলগ্ন শিক্ষকদের আবাসে ও মধুসূদন দে’র বাড়িতে হামলা চালায়। সৈন্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ নং বাড়ির বাসিন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুলের শিক্ষক মোহাম্মদ সাদেককে হত্যা করে। ২৩ নং নীলক্ষেত আবাসের ছাদে আশ্রয়গ্রহণকারী নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি থেকে পালিয়ে আসা বাঙালি পুলিশ কর্মচারী, প্রেসিডেন্ট হাউস (পুরাতন গনভবন) প্রহরারত বাঙালি ইপিআর সদস্য এবং নীলক্ষেত রেল সড়ক বস্তি থেকে আগত প্রায় ৫০ জনকে সৈন্যরা হত্যা করে লাশ ফেলে যায়। ২৫ থেকে ২৭ মার্চের মধ্যে তিনটি ধর্মস্থান ধ্বংস ও ঐ সব স্থানে হত্যা যজ্ঞ চালায়। তিনটি স্থান ছিল, কলা ভবন সংলগ্ন শিখ গুরুদ্বার, রমনার মাঠে দুটি কালি মন্দির এবং শহীদ মিনারের বিপরীত দিকে অবস্থিত শিব মন্দির। সে রাতে আরো নিহত হয় দর্শন বিভাগের কর্মচারী খগেন দে, তার পুত্র মতিলাল দে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী সুশীল চন্দ্র দে, বোধিরাম, দাক্ষুরাম, ভীমরায়, মনিরাম, জহরলালা রাজভর, মনভরন রায়, মিস্ত্রি রাজভর, শংকর কুরী।
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ রাত ৩:৩৩