somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রেবতী – আমার ব্যক্তিগত নক্ষত্রের নাম

০৫ ই এপ্রিল, ২০১১ সকাল ৮:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি হলাম বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। আমার বাবা মা দুজনেই ডাক্তার। ডাক্তার দম্পতির একমাত্র সন্তান হিসাবে আমার যেরকম হওয়ার কথা ছিল আমি তার ধারেকাছেও না । আমি হলাম অগোছালো,উদাসীন,খামখেয়ালি,বাউণ্ডুলে টাইপ একটা ছেলে। কোন কিছুতে মনোযোগ নেই,জীবন নিয়ে সিরিয়াস কোন ভাবনা নেই। আমার বাবার টাকা পয়সার দিক থেকে সচ্ছলতার ব্যাপারটা হয়ত আমার এরকম হওয়ার পিছনের কারণ হতে পারে। আমার এক খালার মধ্যস্থতায় রেবতীর সাথে আমার বিয়ে হয়। বিয়ের পর রেবতী সম্পর্কে আমার ধারনা ছিল যেহেতু সে আধুনিক সমাজে বেড়ে উঠা একটা শিক্ষিত মেয়ে, সেহেতু তার চলাফেরায় সেই ভাবটা পরিলক্ষিত হবে। কিন্তু যত দিন যেতে লাগল ততই আমার ধারনা ভুল প্রমাণ হতে লাগল। আস্তে আস্তে বুঝলাম সে একটা সহজ সরল বাঙালি বধূ টাইপ গুণবতী ও হাসিখুশি মেয়ে। তার সাথে কেউ কথা বলে চিন্তাই করতে পারবে না যে – সে ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স পাশ করা একটা মেয়ে ।

তরুণ ছেলেমেয়েদের মাঝে বিয়ে পরবর্তী জীবন নিয়ে কিছু স্বপ্ন থাকে – কিছু কল্পনা থাকে। কিন্তু কেন জানি আমার মাঝে সে ধরনের কিছু কখনই ছিল না। তবে আমার স্ত্রী রেবতীর মাঝে সেটা খুব প্রকটভাবে ছিল । কোথায় হানিমুনে যাব,প্রথম বিবাহ বার্ষিকীর কেকটা কি ধরনের হবে,তার জন্মদিনে কোথায় ক্যান্ডল লাইট ডিনার করব,আমার জন্মদিনে সে কি গিফট দিবে ,আমাদের প্রথম বাচ্চার নাম কি হবে,আমাদের ঘরের জানালার পর্দার রঙটা কি হবে ব্লাব্লাব্লা । তার এসব চিন্তাধারা আমার কাছে ছেলেমানুষি মনে হত। তাই সবসময়ই তার এসব ব্যাপার আমি এড়িয়ে যেতাম। আমার এই এড়িয়ে যাইয়াটা মাঝেমাঝে তাকে কষ্ট দিত, সেটাও আমি বোঝতে পারতাম। আমি তাকে বলতাম হিন্দি সিনেমা দেখা একটু কমাও, দেখবে তোমার এসব রোমান্টিকতা আর তোমার মাঝে থাকবে না। একসময় সে হিন্দি সিনেমা দেখা একেবারে ছেড়ে দিল কিন্তু তার মাঝে বাস করা রোমান্টিক চিন্তাধারাগুলো ঠিকি আগের মত করে রয়ে গেল ।

আমি যখন কাজ থেকে ফিরি কলিং বেল টিপবার আগেই সে দরজা খুলে দেয়। তার দরজা খোলা দেখেই বুঝতে পারি সে আমার জন্য অপেক্ষায় ছিল। আমার গোসলের জন্য বাথরুমে সবকিছু রেডি করে রাখে। গোসল করে এসে টেবিলে খাবার রেডি করা পাই। আমি যতক্ষণ খাবার খাই সে ততক্ষণ আমার পাশে বসে থাকে। আমার খাবার শেষ হলে সে খায়। তার দাদির কাছ থেকে সে জেনেছে স্বামীদের খাওয়ার পর নাকি স্ত্রীদের খেতে হয়। তা না হলে নাকি স্বামীর অমঙ্গল হয়। তার এই স্বামীর অমঙ্গল পদ্ধতিটা যে খুবই প্রাচীন কুসংস্কারে ঘেরা, সেটা আমি অজস্রবার বুঝিয়েও তাকে বুঝাতে ব্যর্থ হয়েছি। একবার আমার প্রচণ্ড কাশি হয়েছিল। কোন ঔষধে কাজ হচ্ছিল না। সে প্রতি নামাজের পর কোরান তেলাওয়াত করে আমার গলায় ফু দিত। তাকে কে নাকি বলেছে এইরকম ফু দিলে কাশি কমে যায়। তার এসব ব্যাপার আমার কাছে খুব হাস্যকর লাগত। তাকে অনেকবার বুঝিয়েও তার এই স্বভাবগুলো বদলাতে পারিনি। সে প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর তাকে আমি সপ্তাহে দুইদিন হসপিটালে নিয়ে যেতাম। একদিন হসপিটালের ক্যান্টিনে চা বিস্কুট খেয়ে বলেছিলাম বিস্কুটটা খুব মজার। এরপর থেকে সে যতবার হসপিটালে গেছে আমার জন্য এক প্যাকেট বিস্কুট নিয়ে এসেছে ।

আমার স্ত্রী রেবতী এখন ইনটেনসিভ কেয়ারে শুয়ে আছে। ডাক্তার বলেছে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা লাগানো কারণে তার নিউমোনিয়াটা এখন চরম পর্যায়ে। তাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এন্টিবায়োটিক দেয়া জরুরী। কিন্তু বাচ্চা পেটে রেখে এন্টিবায়োটিক দেয়া সম্ভব নয়। তাই অপারেশন করে বাচ্চা বের করে নিতে হবে। এই অপারেশন করতে গিয়ে বাচ্চা বা মা যে কোন একজনকে বাঁচানো সম্ভব। কিন্তু তারা শিউর হয়ে বলতে পারছে না কাকে বাঁচানো যাবে। তবে তারা সর্বাত্তক চেষ্টা করছে কিভাবে দুইজনকে বাঁচানো যায়। রেবতীর একবার জ্ঞান ফিরেছিল। আমার দিকে তাকিয়ে একটা বাক্যই সে বলেছে-তোমার খাওয়া দাওয়া ঠিকমত হচ্ছেতো। আমি তাকে কিছুই বলতে পারিনি শুধু তার স্বাপ্নিক চোখে দেখেছি টলমল করছে তার সেই রোমান্টিক স্বপ্নগুলো। যে স্বপ্নগুলো আচানক এক সুখের তুলিতে পুরাপুরি আমাদের দুজনের জন্য আঁকা হয়েছিল ।

কিছুক্ষণ আগে একজন নার্স আমাকে বলে গেল -একটু পরেই রেবতীকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হবে।এক হাতে হসপিটাল ক্যান্টিনের সেই বিস্কুটের প্যাকেট আর অন্য হাতে বাচ্চাদের নামের একটা তালিকা নিয়ে আমি এখন হসপিটালের বারান্দায় বসে আছি। যে নামের তালিকাটি রেবতী বানিয়ে আমাকে দিয়ে বলেছিল – এখান থেকে একটা ছেলের আর একটা মেয়ের নাম বাচাই করে দিতে। কিন্তু রেবতীকে আমার কোন নাম পছন্দ করে দেয়া হয়নি। কোনদিন তাকে বলা হয়নি- আমার একটা ব্যক্তিগত নক্ষত্র আছে, যার নাম রেবতী।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ রাত ২:৫৩
৩৭টি মন্তব্য ৩৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধর্মের অবমাননা রুখতে গিয়ে নিজের ধর্মকেই ছোট করছেন না তো?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৫


সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ধর্ম অবমাননার আবার একটা ঘটনা ঘটলো। ২৩ জুন ২০২৬। প্রিন্স রায় দীপ্ত নামের পঁচিশ বছরের একটা ছেলে নবীজিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারতীয় মুসলিমদের অসহনীয় জীবন

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৫ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:১৫


পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার সুপুরডিহি গ্রামের ঠেলাগাড়িতে বাসনপত্র বিক্রেতা দরিদ্র মুসলিম আকবর ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানধারী জঙ্গি হিন্দুদের হাতে প্রাণ দিলেন, আর মুক্তি পেলেন অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে। পুরুলিয়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানবজমিন, পার্থিব, চক্র: শীর্ষেন্দুকে যেমন পড়লাম

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ২৫ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:০৯



শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় লেখা শুরু করেন সাধারণত খুব অদ্ভুতভাবে।

যেমন তিনি চক্র উপন্যাস শুরু করেছেন একটি সাপের দৃষ্টিকোণ থেকে। হঠাৎ পড়ে বোঝা যায় না তিনি কার কথা বলছেন, কী বলছেন। সাপ চলতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নতুন মসজিদের কাজ শুরু করলাম

লিখেছেন প্রামানিক, ২৫ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৬


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক

আলহামদুলিল্লাহ্, নতুন মসজিদের কাজ আজ থেকে শুরু হলো। আজ সকাল দশটায় গ্রামের কয়েকজন ধর্মপ্রাণ উদ‍্যোগী মানুষ নিজ উদ‍্যোগেই মাটি কেটে দিয়েছে।

আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর পূর্বে আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাসাহাসি থেকে সাফল্যের ইতিহাস: বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৫২



এক সময় অনেক সমালোচনার মুখে ছিল বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ (সাবেক বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১)। তখন অনেকেই বলেছিল, এত টাকা খরচ করে এসব করে কোনো লাভ হবে না। কিন্তু আজ ধীরে ধীরে সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×