somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অস্তাচলের রবির আলো। (১)

০১ লা অক্টোবর, ২০১০ সকাল ১১:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


কালিম্পং থেকে গুরুতর অসুস্থ হয়ে ফেরার পর কবিগুরুর শরীর ক্রমশ ভেঙ্গে পড়লো। কানে কম শোনেন। চোখের দৃষ্টি আবছা। প্রখরতা হারিয়ে রবির আলো যেন শান্ত হয়ে এসেছে। প্রখ্যাত চিকিৎসক বিধানচন্দ্র রায়ের মত লোকও মত দিলেন অস্ত্রপচার করতেই হবে। মুত্রাশয়ের গোলমালটা জটিল আকার ধারন করেছে।
জাতির প্রয়োজনে বিশ্বকবির আরো কিছুদিন বেঁচে থাকা দরকার। গোটা পৃথিবী জুড়ে যুদ্ধান্ধ আবহাওয়া। ভারতবর্ষেও স্বাধীনতার লড়াই বিচিত্র আকার ধারন করেছে। এই সন্ধিক্ষনে কবিগুরুর মৃত্যু-সম্ভাবনা কেউ মেনে নিতে পারছেন না। জোড়াসাঁকোয় কবির রোগশয্যার পাশে গান্ধীজির চিঠি নিয়ে মহাদেব দেশাই উপস্থিত হন। স্বয়ং গান্ধীজির প্রার্থনা- “প্রিয় গুরুদেব, আপনাকে এখনও কিছুকাল বাঁচিতেই হইবে। বিশ্বমানবের জন্য আপনাকে প্রয়োজন”। চিনের প্রেসিডেন্ট-পত্নী মাদাম চিয়াং কাইশেক, নেহরুজি, উদয়শংকর, লর্ডবিশপ, অসগড়ের রাজা, সেরগুজার মহারাজা, নেপালের মহারাজা, বাংলার গভর্নর- গন্যমান্যদের মাঝে সবাই ব্যাকুল, সবাই চান রবীন্দ্রনাথের আরোগ্য।

অপারেশনে কবি সম্মত নন। কিছুটা সুস্থ হতেই তিনি জোড়াসাঁকো ছেড়ে শান্তিনিকেতনে ফিরে উদয়নে উঠলেন। অগনিত মানুষের ভিড় থেকে তাঁকে আড়াল করে রাখা ও নিরন্তর পর্যবেক্ষন, পরিচর্যার কারনেই তাঁকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে আসা। কারন চিকিৎসকেরা মনে করছেন, সামান্য উত্তেজনাও কবির জন্য চরম ক্ষতিকর। রবীন্দ্রনাথের সেক্রেটারি অনিল চন্দ বিবৃতি প্রকাশ করতে বাধ্য হন-
“গুরুদেব আশ্রমে ফিরিবার নিমিত্ত অত্যধিক আগ্রহ প্রকাশ করায় এবং শান্তিনিকেতনের মনোরম পরিবেষ্টনী এবং সুখপ্রদ আবহাওয়া তাঁহার স্বাস্থ্যলাভের অনুকুল হইবে- চিকিৎসকগণ এইরুপ অভিমত প্রকাশ করায় তাঁহাকে এখানে আনা হইয়াছে। তিনি এখনো ঘরের বাহির হন না, এবং বর্তমানে তাঁহার নিয়মিত চিকিৎসা চলিতেছে। তিনি আগন্তকগণের দেখা-সাক্ষাত করিতে অথবা নিজে চিঠিপত্রের উত্তর দিতে সক্ষম নহেন। সুতরাং, বন্ধুগণকে অনুরোধ করিতেছি, তাহারা যেন কবিগুরুর সহিত সাক্ষাত করিবার নিমিত্ত শান্তিনিকেতন না আসেন অথবা উত্তর পাইবার আশা করিয়া তাঁহার নিকট কোন পত্র না লিখেন।

গৃহবন্দি কবির সৃজন কিন্তু থামেনি। “রোগশয্যা”র কবিতাগুলো এই সময়ই রচিত। কিছু জোড়াসাঁকোয় থাকাকালিন, বাকিগুলো লিখলেন শান্তিনিকেতনে ফিরে। উৎসর্গ করলেন নন্দিতা ও অমিতাকে। নন্দিনি কৃপালিনি, কনিষ্ঠা কন্যা মিরাদেবীর কন্যা, আর অমিতা ঠাকুর বাড়ীর বধু, অজিতকুমার চক্রবর্তীর কন্যা। গুরুতর অসুস্থ কবিকে নিরলস সেবা করেছেন এই নন্দিতা, অমিতা। সেই সাথে অনিল চন্দ, রানী চন্দ, সুধাকান্ত রায়চৌধুরী, সুরেন কর, রানী মহলানবিশ, মৈত্রয়ী দেবী, বিশ্বরুপ বসুর নাম উল্যেখযোগ্য।
সবাই অবাক হয়ে দেখেছেন, যার জন্য দেশবাসী উদ্বিগ্ন, তিনি নিজের রোগ-যন্ত্রনা আড়াল করার জন্য আপ্রান চেষ্টা করে চলেছেন। ক্লান্ত গলায় হাসি-ঠাট্টা করে নিজেকে ভারমুক্ত করতে চাইছেন।
রবীন্দ্রনাথ কারো কাছে সেবা নিতে সংকোচ বোধ করতেন। কিন্তু এখন অসহায় ভাবেই সব মেনে নিতে হচ্ছে। বার বার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। অস্তাচলকে মানসচক্ষে যেন দেখতে পেতেন। বলতেন, “মন ক্লান্ত হয়ে গেছে রে, এবার বিদায় নিলেই হয়”।
জীবনের শেষ সাতই পৌষ ঘরের বাইরে যেতে পারেন নি। সাতই পৌষের ভাষনটি মুখে বলে গিয়েছিলেন, লিখে নিয়েছিলেন কবি অমিয় চক্রবর্তী। “আরোগ্য” নামে সেই বক্তব্যে বলেছিলেন, “আজ আমি রোগের দশা অতিক্রম করছি বলেই আরোগ্য কাকে বলে সেটা বিশেষ ভাবে অনুভব করি...”।
জীবনের প্রতিটি পর্বকেই তিনি অর্থময়, ব্যঞ্জনাময় হিসেবে দেখেছেন। শেষ বয়সের অসুস্থতাকেও দার্শনিক দিক থেকে দেখেছেন। ছোট্ট কবিতায় লিখলেন,- “ হেরি আমি আপন আত্মারে মৃত্যুর অতীত”।
আত্বত্রুটি বিশ্লেষনে বরাবর অভ্যস্ত ছিলেন। শেষের দিকের কবিতায় বার বার প্রকাশ করেছেন নিজের অক্ষমতাকে। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কবির স্বীকৃতি পেয়েও রুগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে জীবনের শেষ শীত ঋতুতে লিখলেন- “ আমার কবিতা জানি আমি, গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী। যে আছে মাটির কাছাকাছি, সে কবির বানী লাগি কান পেতে আছি”।
শেষ সময় সমাসন্ন উপলব্ধি করেই যেন কবি বিচিত্র রচনা-কার্যে মেতেছেন। “জন্মদিন” এবং “আরোগ্য” পর্যায়ের কবিতা লিখা ছাড়াও হাত দিয়েছেন শিশুদের দ্রুতপাঠ-উপযোগি সরস গ্রন্থ রচনায়, যা শান্তিনিকেতনের পাঠভবনের পাঠগ্রন্থমালায় অন্তর্ভুক্ত হবে। “গল্পসল্প” নামের বইটিতে ষোলটি গল্প ও ষোলটি কবিতা থাকল। চরিত্রগুলির মাঝে ছাপ পড়ল রবীন্দ্রনাথের ছেলে-বেলায় দেখা মানুষদের।
ছন্দে ছন্দে নেচে উঠল সবগুলি কবিতা। কোথাও কোন অবসাদের চিহ্ন নেই।

চলবে...।


সুত্রঃ বাইশে শ্রাবনঃ বিভাস রায়চৌধুরী।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০১১ বিকাল ৪:৪৭
৩৬টি মন্তব্য ৩৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×