মানচিত্রে সেন্ডাই
১৯৪৫ সালের ৬ই অগাষ্ট দ্বীতিয় মহাযুদ্ধের সময়, হিরোশিমা আর নাগাসাকি জাপানের দুটি শহর মিত্র বাহিনীর আনবিক বোমার আঘাতে এক মুহুর্তে ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয়েছিল, এটা সবার জানা।তবে আজ বলবো মানুষ সৃষ্ট বিপর্যয়ের কথা নয়,এটা প্রকৃতির সৃষ্টি । সমুদ্র থেকে ধেয়ে আসা জলোচ্ছাস একটি শহর কিভাবে ধ্বংসস্তুপে পরিনত করে এটা দেখেছে সেই জাপানবাসীরাই আরেকবার ২০১১ সালে।
বাসে করে সেন্ডাই শহর অভিমুখে
১১ই মার্চ ২০১১ স্থানীয় সময় ২.৪৬ জাপানের রাজধানী টোকিও থেকে ৪০০ কিমি দূরে সমুদ্রতীরবর্তি শহর সেন্ডাই। মানুষ যে যার মতন কাজে ব্যাস্ত।কল কারখানায় ব্যাস্ত শ্রমিক, বেচা বিক্রির পর দোকান পাটে চলছে দোকানীদের মধ্যানহকালীন খাবার পর্ব, জেলেরা সমুদ্রে মাছ ধরছে নিশ্চিন্তমনে। ঠিক এমনি সময় সারা শহরটি মনে হয় কেঁপে উঠলো।
সমুদ্র আর পাহাড়ের মাঝে সেন্ডাই
যদিও বহু আগে থেকেই তাদের এলাকাটি প্রায় টলে ওঠে হাল্কা ভাবে। কিন্ত এবার আর হাল্কা নয়, ১৩০ কিমি পুর্ব দিকে সমুদ্রে উৎপন্ন এক ৯ মাত্রার প্রচন্ড ভুমিকম্প আঘাত হানলো সেন্ডাই সহ তার আশেপাশের এলাকায় তার সর্ব শক্তি দিয়ে।যা ছিল ১৯০০ সালের পর পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ভুমিকম্প আর জাপানের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকরতম।
বাসের জানালা থেকে তোলা সমুদ্র তীর
মোট আটটি প্লেটের উপর আমাদের মহাদেশগুলোর অবস্থান। এই প্লেটগুলো সবসময়ই তাদের স্থান পরিবর্তন করে চলছে।বিশেষজ্ঞদের মতে ভাসমান প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেটটি উত্তর আমেরিকা এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের নীচে এসে ধাক্কা দেয়ার ফলশ্রুতিই ছিল এই ভয়াবহ ভুমিকম্পের কারন।
কার যেন বাড়ী,সুনামীর ভয়াবহ স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে
ইউ এস জিওলজিক্যাল সার্ভের মতে সমুদ্র পৃষ্ঠের ২৪.৪ কি.মি গভীরে এই ভুমিকম্পের উৎপত্তি হয়। প্লেটগুলোর ঘর্ষনে সেখানে ছোট ছোট মাত্রার ভুমিকম্প হচ্ছিল অনেক আগে থেকেই। কিন্ত ১১ ই মার্চ জাপান উপকূলের অদুরে ৯ মাত্রার প্রচন্ড ভুমিকম্প সৃষ্টি হলে সমুদ্র থেকে ধেয়ে আসে সুনামী নামে পরিচিত সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, আঘাত হানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের সর্বত্র । কিন্ত লন্ডভন্ড করে দেয় জাপানের সেন্ডাই শহর।
সেন্ডাই শহর
পাহাড় সমান উচ্চতার সেই সামুদ্রিক ঢেউ সুনামী একের পর এক আঘাত হানতে থাকে আধখানা চাঁদের আকারের মত দেখতে সমুদ্রের দিকে ঢালু জাপানী ভুভাগ যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল সেই নিরিবিলি শান্তসিষ্ট শহর সেন্ডাই ।
প্রবল বেগে ধেয়ে আসছে সমুদ্রের গ্রাস
সর্বোচ্চ ৩৩ ফিট উচু এই জলোচ্ছাস ভাসিয়ে নিয়ে যায় প্রবল স্রোতে সমুদ্র বন্দর থেকে বিমান বন্দর।নিমিষে ভেঙ্গেচুড়ে ভাসিয়ে নিতে থাকে সমুদ্র তীর ঘেষে সৃষ্ট বনায়ন কর্মসুচীর গাছপালা থেকে বাড়ীঘর, কল কারখানা সেই সাথে মানুষ জন। একদা কর্মব্যাস্ত কোলাহল মুখর একটি শহর হয়ে পরে জঞ্জালের স্তুপ।
বাসের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে সুনামীর ক্ষত
সেন্ডাইএর নাটোরি নদীর মধ্যে দিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে পড়ে সমুদ্রের নোনা জল।লবনাক্ত হয়ে পরে সেখানকার বিস্তীর্ন এলাকা।সরকারী হিসাব মতে প্রায় ১০,০০০ এরও বেশি মানুষ মারা যায় এই ভয়ংকর সুনামী নামের প্রকৃতির নির্মম থাবায়।
সুনামীর স্মৃতি বুকে নিয়ে আস্ত বাড়ীটি উলটে পড়ে আছে
তবে বেসরকারী হিসেবে মৃতের সংখ্যা আরো অনেক বেশী। হাজার হাজার গৃহহীন আতংকিত সেন্ডাইবাসীরা যারা অপরূপ সুন্দর রুচিশীল ঘরবাড়ীতে বসবাস করে এসেছে যুগ যুগ ধরে, তারা এসে উঠলো সরকারী আশ্রয় কেন্দ্রে।
ধ্বংস স্তুপের মাঝে এক সব হারানো মেয়ের কান্না
খাবার, পানীয় জল, বিদ্যুত এবং যানবাহনের অভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে সমগ্র শহরবাসী।মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়ে অনেকেই।
সমুদ্রগামী বিশাল জাহাজ চলে এসেছিল ডাঙ্গায়
সেই জাহাজ এখন ভয়ংকর সেই সুনামীর স্মৃতিস্মারক হিসেবে সংরক্ষিত
তবে এই সুনামীর আঘাতে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটলো যেটা সেটা হলো সেন্ডাইএর কাছে ফুকোশিমুর দুটো নিওক্লিয়ার পাওয়ার স্টেশন ভয়ংকর ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। যেখান থেকে এখনো তেজস্ক্রীয় বিকিরন চলছে যা এখনো বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।যদিও সেখানে কর্মরত ইঞ্জিনিয়াররা বলছে এই চুইয়ে পড়া তেজস্ক্রীয় পদার্থ থেকে জানমালের কোন ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। কিন্ত এও কি বিশ্বাসযোগ্য!
সুনামীর স্মৃতি
মনুষ্য বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে পরিবেশ।দুষিত হয়ে পড়ছে খাবার পানি।ক্যান্সারের মত ভয়াবহ রোগের আশংকা বেড়ে চলেছে ক্রমাগত।শুধু তাই নয় সমুদ্র তীরবর্তী এই পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে সমুদ্রের পানিতে মিশে যাচ্ছে তেজস্ক্রীয় পদার্থ।ফলে হুমকীর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন সামুদ্রিক জীব যার উপর নির্ভর করে আছে সেন্ডাই এর বিপুল সংখ্যক জনগন যারা মাছ ধরা আর প্রক্রিয়াজাতকরনের সাথে জড়িত।
মাছ প্রক্রিয়াজাতকরনের সাথে জড়িত কিছু
এছাড়া সুনামীর আঘাত শহরের অধিকাংশ এলাকার ঘর বাড়ী গাছপালা উপড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল সমুদ্রে।সেই জঞ্জালের পাহাড় সমুদ্র আবার ফিরিয়ে দিয়ে গেছে সেন্ডাই শহরে।সেসব পরিষ্কার করাও জাপান সরকারের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
সেন্ডাই এয়ারপোর্ট
সেই সাথে সেখানকার আতংকিত জনগনকে কি ভাবে আবার পুনর্বাসন করা যায় তা নিয়ে চলছে বিস্তর গবেষনা। কারো কারো মতে পুরো সমুদ্র তীর ধরে উচু দেয়াল বানিয়ে দিলে আর পরে এমন বিপদ হবে না।
দেয়ালে আঁকা ভয়াবহতার চিত্র বাসের জানালা দিয়ে
এই অবাস্তব প্রস্তাবে অনেকেরই আপত্তি বিশেষ করে সেখানকার সমুদ্রে মাছ ধরা জেলে সম্প্রদায়ের ।তাদের চাই খোলা সমুদ্র তীর।
খোলা সমুদ্র তীর
তাদের এই অভিনব এবং আজগুবী চিন্তা ভাবনার কথায় মনে পড়লো রবি ঠাকুরের জুতা আবিস্কার কবিতাটির কথা।যেখানে রাজার পারিষদরা রাজার পায়ে যেন ধুলো না লাগে তার জন্য অনেক চিন্তা ভাবনার পর বুদ্ধি দিয়েছিল সারা পৃথিবী চামড়া দিয়ে ঢেকে দেয়ার । তখন এক মুচীকে ডাকা হলে সে বলেছিল:
‘নিজের দুটি চরণ ঢাকো, তবে
ধরনী আর ঢাকিতে নাহি হবে’
তেমনি সেই রাজার পারিষদদের বুদ্ধি দেয়াল দিয়ে তীর ঘিরে ফেল আর সুনামী আঘাত করার পর হাতে ৬ মিনিট সময় পাবে।কিন্ত এই সংক্ষিপ্ততম সময়ে কত জন নিরাপদ আশ্রয়ে যাবার সুযোগ পাবে ?
এই সেই তিন স্তর বিশিষ্ট পাথুরে দেয়ালের কিছু অংশ।
কেউ বা বলছে পাহাড়ের উপর জনগনকে ঘর বাড়ী বানিয়ে দেয়ার জন্য, অত উচুতে জলোচ্ছাস উঠতে পারবেনা।
নানা মুনির নানা মত চলছে এখনো।
ভেঙ্গে পড়ে আছে বিল বোর্ড
সেন্ডাই এর স্থানীয় জনগন অনেকের সাথে আলাপ করে আমার ছেলে জানতে পেরেছে তাদের অনেকেই এখনো সেই আতংক কাটিয়ে উঠতে পারেনি । স্থানীয় টাউন হলে কর্মরত সরকারী কর্মচারীরা সবাই সেই ভয়ংকর সুনামীতে ভেসে গিয়েছিল।একজনও বাচেনি সমুদ্রের রোষ থেকে।একজন কর্মচারী ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে গিয়ে বিল্ডিং এর এক লোহার শিকে আটকে যায় । কিন্ত শেষ রক্ষা হয়নি। জ্যাকেটটা আটকে থাকে কিন্ত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সেই তীব্র স্রোত।
লোহার শিকে আটকে থাকা এই সেই জ্যাকেট।
অনেকে ভয়ে সেই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে চায়,যেতে চায় নিরাপত্তার জন্য,কিন্ত স্থানত্যাগের সরকারী অনুমতি মিলছে না।প্রিয়জনকে হারিয়ে কয়েকজন আত্মহত্যা করেছে বলেও শোনা যায় বিভিন্ন মাধ্যমে।
আবার আস্তে আস্তে জেগে উঠছে শহর পুরোনো রুপে
তারপরও জাপান সরকার আপ্রান চেষ্টা করছে ক্ষতিগ্রস্তদের পুরনো জীবনে ফিরিয়ে দেয়ার। কি ভাবে খুব শীঘ্রই তাদের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা যায় সেই কৌশল উদ্ভাবন করতে আলাপ আলোচনা করছে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের সাথে ।
ভেঙ্গে চুড়ে থাকা ঘর বাড়ী
সরকারের সাথে সেখানকার বিভিন্ন কল কারখানার কর্মকর্তারাও চেষ্টা করে যাচ্ছে সেখানকার জনগনের পুনর্বাসনের ব্যাপারে। উল্লেখ্য সেখানে জাপানের বেশ কিছু গাড়ী নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নির্মান কারখানাও রয়েছে।ধ্বংস প্রাপ্ত সেই শহরের এক কর্মচারী দেখাচ্ছিল প্রকৃতির ভয়াবহ তান্ডবের স্থির চিত্র।
সেই বিল্ডিং এর উপর সমুদ্র থেকে উঠে এসেছিল জাহাজ।
সেখান থেকে ঘুরে এসে আমার ছেলের মুখে শোনা সেন্ডাইবাসীর করুন কাহিনী আর তার তোলা ছবি দিয়ে আজকের ব্লগ।
সমুদ্র উপকূলে সামাজিক বনায়ন আজ ধ্বংসের মুখে
নিহতদের স্মরণে ফুল
১, ৭, ১০,১১,১৪,১৬ নেট থেকে, বাকি সব ছবি আমার ছেলের তোলা