এ কে ফজলুল হকের একটা চুটকি বলি। পড়েছিলাম এইসএসসি'তে পড়ার সময় মনে হয় প্রথম আলোর কোন একটা কলামে। হক সাহেবকে তখন ইসলামের শত্রু, ভারতের দালাল এসব বলত মৌলবাদীরা। তিনি দেশের কোন এক জায়গায় বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। তখন চুটিকিটা বলেছিলেন।
"গ্রামের কোন এক খাঁ খাঁ দুপুর। গৃহিনীরা খুব ব্যস্ত তাদের স্বামী কৃষকদের খাবার তৈরীতে। কৃষকরা সারা সকালবেলা ক্ষেতে অনেক পরিশ্রম করে গোসল সারতেছে গ্রামের পুকুরে। এমনসময়ই হঠাৎ আওয়াজ উঠল জোরে "ইসলাম ডুবে যাচ্ছে, ইসলাম ডুবে যাচ্ছে"। গ্রামের এত সাচ্চা মুসলমান থাকতে ইসলাম ডুবে যাবে তা হতে পারেনা। তাই সবাই দৌড়াতে থাকল যেদিক থেকে আওয়াজ আসতেছিল সেদিকে। যেতে যেতে একটা খালের পাড়ে গেল সবাই। দেখল নুরুল ইসলাম নামে গ্রামের একজন মদ্যপ মদ খেয়ে মাতাল হয়ে খালে পড়ে গেছে। নুরুল ইসলাম ডুবে যাচ্ছে। ইসলাম ডুবে যাচ্ছে।"
১৯৯১ সালের নির্বাচনে আমাদের এলাকা থেকে আ'লীগে দাঁড়িয়েছিল নাজিম উদ্দিন। ভদ্রলোক অত্যন্ত ভালমানুষ, খুবই ধার্মিক। দানশীলতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। বিএনপি থেকে দাঁড়িয়েছিল ওয়াহিদুল আলম। চিটা বলে একনামে পরিচিত। ধার্মিক তো দূরের কথা। কিন্তু নাজিমউদ্দিনকে ভোট দিলে ইসলাম চলে যাবে, বিসমিল্লাহ্ উঠে যাবে, ভারত দেশ দখল করে ফেলবে, সর্বোপরি মসজিদে উলু পড়বে। তাই ইসলামপ্রেমী জনগণ ইসলামকে বাঁচানোর স্বার্থে ওয়াহিদ সাহেবকে ভোট দিলেন। তিনি পরবর্তীতে একটা মসজিদে ভুয়া চেক দিয়েছিলেন! আমার এলাকার লোকজন ইসলাম রক্ষার জন্য খুবই মরিয়া ছিলেন। তবে নামাজ পড়তে কাউকে পাওয়া যায়না। বেশিরভাগ ইসলাম রক্ষা করবে এরকম জনগণ শুক্রবারে ১ বার মসজিদে যায়, ফজরের নামাজে কস্মিনকালেও পাওয়া যায়না তাদের। অন্যলোকের হক মেরে খায়, সুদ-ঘুষ সবই সমানে চলে। বউয়ের বাপের কাছ থেকে যৌতুক না নিলে বউয়ের জীবন জাহান্নাম বানিয়ে ফেলে, কিন্তু ইসলাম আর বিসমিল্লাহ রক্ষার জন্য প্রথম কাতারে আছেন। আমার এক খুব ধার্মিক বন্ধু বলেছিল বাংলাদেশের মানুষ ধার্মিক না, ধর্মভীরু অথবা হুজুগে ধর্মপ্রেমিক বলা যায়। ফজরের নামাজ পড়তে যাওয়া খুব কঠিন, কিন্তু মিছিল করে ভাংচুর করে ইসলাম রক্ষা করা খুবই সহজ।
তাসলিমা নাসরিনকে যখন দেশ থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি। স্কুলের সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে মিছিলে যেতে হয়েছিল তাসলিমা নাসরিনের ইসলাম অবমাননার প্রতিবাদস্বরুপ। মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিল শিবিরের এক পাতিনেতা(এখন নেতা হয়েছে)। সে পরবর্তীতে অনেকবার চুরির জন্য ধরা খেয়েছে। টেম্পু চুরির অপরাধে অনেক মার খেয়েছে, জেল খেটেছে। তাসলিমার গালে গালে, জুতা মার তালে তালে। শ্লোগাণে মুখরিত আকাশ-বাতাস। ইসলামপ্রেমী সাচ্চা মুসলমানরা জেগে উঠেছে তাসলিমার ইসলাম অবমাননার বিরুদ্ধে। আমরা মিছিলে খুব জোশের সাথে শ্লোগান দিচ্ছি। উল্লেখ্য তাসলিমা কে, তিনি কি বলেছেন সেসব সম্পর্কে আমাদেরও কোন ধারণা নেই, নেতৃত্ব দেয়া শিবির নেতারও কোন ধারণা নেই। পরে যখন দশম শ্রেণীতে পড়ি তাসলিমা নাসরিন সম্পর্কে আবছা ধারণা পেয়েছি। "লজ্জা" বইটা হতে আসল। পড়ে দেখলাম, কিন্তু ইসলাম অবমাননার কোন কিছু খুঁজে পাইনি। বাংলাদেশে যে হিন্দুদেরকে বিভিন্নভাবে রাখা হচ্ছে সেটা তিনি ফ্যাক্টস আর ফিগার দিয়ে ভালমতে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। বাবরী মসজিদের ভাংগার সময় জামাতের নেতৃত্বে যে হিন্দুদের উপর স্টিমরোলার চালানো হয়েছিল সেটা লজ্জায় ভালমতে এসেছিল। সাহিত্যমান হিসেবে ধরতে গেলে বইটা সাহিত্যমান উর্ত্তীন হয়না সেটা বলাই বাহুল্য। তাসলিমা নাসরিনের বেশিরভাগ লেখাই সাহিত্যমান উর্ত্তীণ হয়না। কিন্তু যে কটু এবং নিষ্ঠুর সত্য তিনি তুলে ধরেন তা আমাদের পঁচণশীল সমাজের প্রতিমূর্তী। "ফরাসি প্রেমিক", "লজ্জা", "নির্বাচিত কলাম" আর "ক" পড়ার সুযোগ হয়েছে। "নির্বাচিত কলাম" খুবই ভাল হয়েছে, "ক" কিছু সত্যকে তুলে ধরলেও তাসলিমা নাসরিনের সাম্প্রতিককালের মানসিক প্রচন্ড চাপের অস্থিরতা দ্বারা আক্রান্ত। "ফরাসি প্রেমিক" ভালই বলা যায়, যদিও পুরোপুরি সাহিত্যমান উর্ত্তীণ না। "লজ্জা" বইটাতে ইসলামের অবমাননা কিভাবে হয়েছে সেটা আমার মাথায় ঢুকেনা। বড়জোড় বলা যায় জামাতের আসল মুখ চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। অপ্রিয় সত্য বলার অপরাধ মিথ্যা বলার চেয়েও মারাত্বক। তাই তাসলিমা নাসরিনকে নিজের প্রিয় দেশ ছেড়ে বিভিন্ন জায়গায় নাগরিকতার জন্য ভিক্ষা করতে হয়। আমাদেরই দেশের এক মেয়ে শুধু অপ্রিয় সত্য বলার অপরাধে হায়দারাবাদে মৌলবাদীদের হাতে মার খায়, এই অপমান কি তাসলিমার? কখনই না। এ অপমান আমাদের মুক্তমনা সকল মানুষের। জাতি হিসেবে এটা আমাদের সকলের জন্য চপেটাঘাত, তথাকথিত আধুনিক ভাবধারীদের জন্য অপমানস্বরুপ।
দাউদ হায়দারের কবিতা তেমন পড়া হয়নি। আমি কবিতা বুঝিনা আসলে। ফিকশানই আমার প্রিয়। তবে যারা কবিতা বুঝেন তাদের কথাবার্তায় বুঝেছি দাউদ হায়দার খুবই মানসম্পন্ন আধুনিক কবি। তিনি বাংলাদেশের প্রথম মৌলবাদিতার শিকার। শুনেছি তিনি নাকি মক্কাকে বেশ্যালয়ের সাথে তুলনা দিছিলেন, তাই তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। পরে দেখলাম তিনি বলেছিলেন(মোটামোটি ইংরেজী থেকে বাংলা অনুবাদ):
"আমি লাখনাওয়ে এসেছি। আমার কি উচিৎ না বাইজীবাড়িতে যাওয়া? না গেলে লোকে কি বলবে? মক্কাতে এসে কা'বা শরীফ না দেখলে কিরকম দেখায়?"
এখানে কিভাবে ইসলামের অপমান হল বুঝলাম না। লর্ডসকে তো ক্রিকেটের মক্কা বলা হয়। তাই বলে কি একটা খেলার স্টেডিয়ামকে মক্কার সাথে তুলনা দেওয়া হচ্ছে? এটার মাধ্যমে বুঝানো হচ্ছে মক্কা যেমন কা'বার জন্য বিখ্যাত, লর্ডস ক্রিকেটের জন্য এবং লাখনাও বাইজী নাচের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু এটা বুঝার জন্য যে পরিমান বাংলা জানা দরকার সে পরিমান বাংলা হুজুর আর জামাতিদের ঘটে নেই। উর্দুতে লিখলে হয়ত বুঝত।
১৯৯৬-২০০১ আ'লীগ আমলে খালেদা জিয়ার লেখাপড়া না জানা নিয়ে সংসদে কোন এক বিএনপি'র এমপি বলেছিল, মহানবী (সাঃ) ও তো উম্মি ছিলেন। উম্মি হয়ে যদি ইসলামের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ নবী হতে পারেন তাহলে খালেদা জিয়া এইট পাশ হয়ে দেশ চালাতে পারবেনা কেন? কথাটায় যুক্তি আছে এবং স্পষ্টত এখানে কোনভাবেই মহানবী (সাঃ) এর অবমাননা হয়নি। কিন্তু আ'লীগের লোকজন এটা নিয়ে গোলমাল করতে চেয়েছিল, ইস্যু বানাতে চেয়েছিল যে খালেদা জিয়া নিজেকে মহানবী (সাঃ) এর সাথে তুলনা করেছে। তবে তারা সফল হয়নি। কারন জামাত তখন বিএনপি'র পক্ষে আর তাছাড়া মোল্লারাও জামাত অথবা বিএনপি'র পক্ষে থাকে সাধারণত। একই কথা যদি কোন লেখক বলত অথবা শেখ হাসিনা বলত তাহলে কিন্তু সেটা অনেক বড় ইস্যু হত আর হয়ত দেশ থেকেই পালাতে হত।
কোনটাতে ইসলামের অবমাননা হয় আর কোনটাতে হয়না সেটা বুঝার মত বুদ্ধি জামতিদের খুব ভালমতেই আছে। কিন্তু রাজনৈতিক মাঠ গরম রাখা আর রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করার জন্য তারা ইসলামকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে থাকে। যখন কার্টুনিস্ট আরিফ "মোহাম্মদ বিড়াল" নিয়ে কার্টুন করে তখন জামাতিরা ভালমতেই জানে যে সেটা মুহাম্মদ (সাঃ) কে অবমাননা করে লিখা হয়নি। তারা নিজেরাই নিজেদের কিশোরকন্ঠে "মোহাম্মদ টাকি মাছ" নিয়ে কৌতুক করেছে। এটা শুধু নির্দোষ কৌতুক, ব্যক্তি মুহাম্মাদ (সাঃ) কে ছোট করার কোন ইচ্ছে আরিফের ছিলনা। আমাদের মধ্যে সব নামের পূর্বে যে "মুহাম্মাদ" বসানোর প্রবণতা সেটার উপর ভিত্তি করেই নির্দোষ কৌতুক-কার্টুনটা রচিত। অবশ্য গোআ, সাইদী, নিজামী এদের কারো নামের সাথেই মুহাম্মদ নেই। তাই আরিফের কার্টুনে বিড়ালের আগে মু্হাম্মাদ লাগানোতে জামাতের কিছু যায় আসেনা, বরং তারা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করার জন্য এটাকে একটা সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে, "প্রথম আলোর মত জামাত-বিরোধী পত্রিকাকে শায়েস্তা করার এই তো সুযোগ" এটা মনে করে করে খুশিতে আটখানা হয় আর মনে মনে হয়ত আরিফকে ধন্যবাদ জানায়। নিজেদের স্বার্থের জন্য এই যে ইসলামকে ব্যবহার করা সেটার জন্য তাদের কি শাস্তি হতে পারে পরকালে? তাদের সম্পর্কেই তিরমিজির হাদিসটা আবার বলি:
"শেষ জমানায় কিছু প্রতারক সৃষ্টি হবে। তারা ধর্মের নামে দুনিয়া শিকার করবে। তারা মানুষের নিকট নিজেদের সাধুতা প্রকাশ ও মানুষকে প্রভাবিত করার জন্য ভেড়ার চামড়ার পোষাক পড়বে (মানুষের কল্যাণকারী সাজবে)। তাদের রসনা হবে চিনির চেয়ে মিষ্টি। কিন্তু তাদের হৃদয় হবে নেকড়ের হৃদয়ের মতো হিংস্র। (তিরমিজী)"
ইসলামের অবমাননা বিষয়টা এখন ক্লিশে হয়ে গেছে। সেই রাখাল বালকের "বাঘ এসেছে" চিৎকারের মত। তাই এখন আসলেই ইসলামের অবমাননা হলে কেউ আর মাথা ঘামায়না। ইসলামের অবমাননা হয় তখন যখন “কোরান হেদায়েতের জন্য যথেষ্ট, কিন্তু নাজাত বা মুক্তির জন্য নয়”- এই মারাত্মক কথা মওদুদী বলে ‘তাফহিমাত’ গ্রন্থের ৩১২ পৃষ্ঠায়। ইসলামের অবমাননা হয় তখন যখন একবার ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম বলে পরে সেই নারীদের শাড়ীর নিচে গিয়ে বসে থাকে। ইসলামের অবমাননা হয় তখন যখন ৭১-এ ইসলামের নামে লক্ষ লক্ষ মানুষকে জামাতিরা হ্ত্যায় সহযোগীতা করে আর লক্ষ মা-বোনকে ধর্ষণের জন্য পাকিদের হাতে তুলে দেয়। ইসলামের অবমাননা হয় তখন যখন সুদকে হালাল বানিয়ে ব্যবসা করা হয়। যখন অন্য মুসলমানকে রাজনৈতিক কারনে হত্যা করা হয়, যখন ক্যাম্পাসে ইসলামের নামে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়, যখন বাবরী মসজিদ ভাংগার পর বাংলাদেশে হিন্দুদেরকে জামাতিরা ভারতের উগ্র হিন্দুদের কাজকর্মের জন্য অমানসিক নির্যাতন করে, যখন ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদেরকে শুধমাত্র আ'লীগে ভোট দেওয়ার অপরাধে বর্বর আক্রমণ চালায় তখনই আসল ইসলামের অবমাননা হয়। অথচ এসব ইসলামের অবমাননার সময় আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকি। যখন যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে নির্যাতন করে তার বাপের বাড়ীতে গরীব বাপের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়, যখন দেশের সবজায়গায় ঘুষের দৌড়াত্বের জন্য কোন কাজই ঘুষ ব্যতিরেকে করা যায়না, যখন সমাজের সর্বস্তরে অন্যায় আর অবিচারের জয়ধ্বনি শুনা যায় তখনই আসল ইসলামের অবমাননা হয়। যখন শুধুমাত্র ভোটে জিতার জন্য সাইদী আ'লীগকে ভোট দিলে ইমান থাকবেনা বলে ঘোষণা দেয়, যখন ইসলামি সম্মেলনের নাম করে সেখানে সাইদী অশ্লীল কথাবার্তার ফুলঝুরি ছোটায় তখনই ইসলামের অবমাননা হয়।
যত তাড়াতাড়ি "ইসলামের অবমাননা" আর "ইসলাম" কে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে, ক্ষমতায় যাওয়ার পথ হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করব তত তাড়াতাড়ি ইসলামের সঠিক বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে।